ডেস্ক রিপোর্ট
পশ্চিমবঙ্গের স্কুল পাঠ্যসূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন পাঠ্যক্রমে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বহুল পরিচিত কবিতা ‘আফ্রিকা’ বাদ দিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিবাজী উৎসব’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাজ্য সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সনাতনী পরম্পরা ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পাঠ্যসূচিতে দেশাত্মবোধের বিষয়টি আরও জোরালো করতেই এসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
‘আফ্রিকা’র পরিবর্তে ‘শিবাজী উৎসব’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতায় ইউরোপীয় সভ্যতার সমালোচনা এবং আফ্রিকা মহাদেশে ঔপনিবেশিকতার প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে।
সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন পাঠ্যক্রমে এই কবিতাটি বাদ দিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শিবাজী উৎসব’ যুক্ত করা হচ্ছে। পরিবর্তনের পেছনে সনাতনী ধারা ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
‘সিরাজদৌল্লা’র জায়গায় ‘মেবার পতন’
শুধু কবিতায় নয়, নাটকের পাঠ্যসূচিতেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
নতুন কাঠামোতে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেবার পতন’ যুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে এতদিন পাঠ্যসূচিতে থাকা ‘সিরাজদৌল্লা’ নাটকটি বাদ পড়ছে।
একই সঙ্গে ইতিহাসের পাঠেও বিষয়ভিত্তিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। নতুন কাঠামোতে মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অংশ সংক্ষিপ্ত করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
কমছে সাম্যবাদ-সংক্রান্ত বিস্তারিত পাঠ
নতুন পাঠ্যসূচিতে সাম্যবাদ বা কমিউনিজম-সংক্রান্ত বিস্তারিত অধ্যায়ও সংকুচিত করার কথা বলা হয়েছে।
ফলে ইতিহাস ও রাজনৈতিক চিন্তাধারার বিভিন্ন বিষয় শিক্ষার্থীদের কাছে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, সেই কাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে।
তবে এসব পরিবর্তনের শিক্ষাগত ও ঐতিহাসিক প্রভাব নিয়ে আলাদা কোনো মূল্যায়ন এই প্রতিবেদনে করা হয়নি; পরিবর্তনগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সিলেবাস কমিটির বক্তব্যই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
ভাষার পাঠেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত
পাঠ্যবইয়ের ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা জানানো হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় ‘পানি’, ‘আব্বা’ ও ‘আম্মু’—এ ধরনের শব্দ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর ফলে ভাষার পাঠে কোন শব্দ, পরিভাষা ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি ব্যবহার করা হবে, সেটিও নতুন করে নির্ধারণ করা হচ্ছে।
বাদ পড়ছে কন্যাশ্রী ও সিঙ্গুর আন্দোলনের প্রসঙ্গ
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের কিছু বিষয়ও নতুন পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে রাজ্য সরকারের আলোচিত ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প এবং ‘সিঙ্গুর আন্দোলন’।
সিঙ্গুর আন্দোলন ২০০৬ সালে টাটা প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কৃষকদের জমি ফেরত দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
এরপর ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে অষ্টম শ্রেণির ইতিহাস বইয়ে সিঙ্গুর আন্দোলন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তবে সংশোধিত পাঠ্যক্রম অনুযায়ী, আগামী বছরের ২ জানুয়ারি শিক্ষার্থীদের হাতে দেওয়া নতুন বইয়ে এই আন্দোলনের অধ্যায় আর থাকবে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঠ্যক্রম পরিবর্তনে বদলাবে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস পাঠ
সাহিত্য, ইতিহাস, ভাষা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনাবলি—একাধিক ক্ষেত্রে একসঙ্গে পরিবর্তন আনা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের স্কুল পাঠ্যসূচিতে।
বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’ বাদ দেওয়া, ‘সিরাজদৌল্লা’র পরিবর্তে ‘মেবার পতন’ যুক্ত করা, মুঘল ইতিহাসের অংশ সংক্ষিপ্ত করা এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত পাঠ্যক্রমের বিষয়বস্তুতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের কন্যাশ্রী ও সিঙ্গুর আন্দোলনের মতো বিষয় বাদ পড়ায় নতুন পাঠ্যবইয়ে পশ্চিমবঙ্গের সমকালীন ইতিহাস কীভাবে উপস্থাপিত হবে, তা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানোর পর সংশোধিত পাঠ্যক্রমের পূর্ণ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

0 Comments