যশোরের চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্রীহরি মন্দিরে এবার দুর্গাপূজাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ব্যতিক্রমী আকর্ষণ। প্রথমবারের মতো মন্দির প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়েছে ১০১টি প্রতিমা। প্রতিমা স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার পর থেকেই মন্দিরে ভিড় করছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দেখতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষের সমাগম ঘটছে।
এদিকে, চলতি বছর যশোর জেলার আটটি উপজেলায় মোট ৭৩৭টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ২৮টি। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজার প্রস্তুতি, মণ্ডপসজ্জা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন আয়োজকেরা।
১০১ প্রতিমায় সাজানো মন্দির, দর্শনার্থীদের বাড়তি আগ্রহ
চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্রীহরি মন্দিরে ১০১টি প্রতিমা স্থাপন এবারের পূজার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ। প্রতিমাগুলো স্থাপন ও সাজসজ্জার কাজ শেষ হয়েছে। এখন চলছে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা ও অন্যান্য প্রস্তুতি।
আয়োজকদের প্রত্যাশা, ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা প্রদর্শনী দেখতে যশোরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও দর্শনার্থী আসবেন। ইতিমধ্যে মন্দির প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
একসঙ্গে এতগুলো প্রতিমা দেখার সুযোগ স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি বাইরের দর্শনার্থীদেরও আগ্রহী করে তুলছে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি প্রতিমা নির্মাণের শিল্পকর্ম ও মণ্ডপের পরিবেশও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
প্রতিমা নির্মাণে আকাশ মণ্ডলের কারিগরি দক্ষতা
১০১টি প্রতিমা নির্মাণ ও সেগুলো যথাযথভাবে স্থাপনের কাজ করেছেন সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কুন্ডুটিয়া এলাকার আকাশ মণ্ডল। এ কাজে তাঁর সঙ্গে ছিলেন সূর্য মণ্ডল, আভরাম মণ্ডল ও দ্বীপ মণ্ডল।
আকাশ মণ্ডল জানান, ২০১৪ সাল থেকে তিনি দেবী প্রতিমা নির্মাণের কাজ করছেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবার চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্রীহরি মন্দিরের প্রতিমা নির্মাণ ও স্থাপনের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
একটি বড় পরিসরের প্রতিমা প্রদর্শনী বাস্তবায়নে নকশা, নির্মাণ, পরিবহন, স্থাপন ও শেষ মুহূর্তের পরিচর্যার মতো একাধিক ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কারিগরদের সমন্বিত কাজই পুরো আয়োজনকে দর্শনার্থীদের সামনে উপস্থাপনের সুযোগ তৈরি করেছে।
৬০০ স্বেচ্ছাসেবক, তদারকিতে ১৫ সদস্যের কমিটি
বৃহৎ এই আয়োজন নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য ৬০০ স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা। পাশাপাশি ১৫ সদস্যের একটি কমিটি সার্বিক কার্যক্রম তদারকি করছে।
চাঁচড়া বর্মণপাড়া গ্রাম উন্নয়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শিমুল বর্মণ জানান, প্রতিবছর এই প্রাঙ্গণে পূজার আয়োজন করা হলেও এবার ১০১টি প্রতিমা স্থাপন বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করেছে। এই প্রদর্শনী দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসবেন বলে তাঁরা আশাবাদী।
চাঁচড়া সর্বজনীন মন্দিরের সভাপতি তাপস বিশ্বাস জানান, এলাকায় এমন বৃহৎ পরিসরের আয়োজন এবারই প্রথম। পূজার পুরোহিত ও বাদক দল চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি প্যান্ডেলের দৃষ্টিনন্দন প্রবেশতোরণ ও মূল মঞ্চ নির্মাণের কাজও এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
যশোরের আট উপজেলায় ৭৩৭ মণ্ডপে দুর্গাপূজা
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যশোরের আটটি উপজেলায় স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে এবার মোট ৭৩৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় মণ্ডপের সংখ্যা ২৮টি বেড়েছে।
মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় পূজার আয়োজন ঘিরে ব্যস্ততা বেড়েছে। পূজামণ্ডপ সাজানো, প্রতিমা স্থাপন, আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং দর্শনার্থীদের চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রতিবেদনটির সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ১০ অক্টোবর শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা এবং ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মাধ্যমে দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট বছরের পূজার পঞ্জিকা অনুযায়ী তারিখ দুটি যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন।
পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ
দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জেলার পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সক্রিয় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ভক্তরা যাতে ভীতিহীন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বড় মণ্ডপগুলোতে দর্শনার্থীদের চাপ সামলানো, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ সচল রাখা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্রীহরি মন্দিরের মতো যেখানে বিপুল দর্শনার্থী সমাগমের প্রত্যাশা রয়েছে, সেখানে স্বেচ্ছাসেবক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
১০১ প্রতিমার আয়োজন ঘিরে প্রত্যাশা
চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্রীহরি মন্দিরের ১০১ প্রতিমার প্রদর্শনী এবারের দুর্গাপূজায় যশোরের অন্যতম আলোচিত আয়োজন হয়ে উঠতে পারে। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এ ধরনের আয়োজন প্রতিমাশিল্পীদের কাজ তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে উৎসবকেন্দ্রিক সমাগম বাড়ায়।
তবে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা ভালো রাখতে প্রতিমা প্রদর্শনের পাশাপাশি শৃঙ্খলা, পরিচ্ছন্নতা, চলাচলের সুবিধা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। আয়োজক, স্বেচ্ছাসেবক ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে উৎসবটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হলে দর্শনার্থীদের জন্য আয়োজনটি আরও উপভোগ্য হয়ে উঠবে।
যশোরের ৭৩৭টি মণ্ডপে দুর্গোৎসবের প্রস্তুতির মধ্যে চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্রীহরি মন্দিরের ১০১ প্রতিমার আয়োজন তাই বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। এখন দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্র এই মন্দির—যেখানে প্রতিমা নির্মাণের কারিগরি দক্ষতা, ধর্মীয় আবহ ও বৃহৎ আয়োজন একসঙ্গে মিলেছে।

0 Comments