Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ডিভিসি-কংসাবতী বাঁধে পানি ছাড়ায় পশ্চিমবঙ্গে বন্যার শঙ্কা, বাংলাদেশের জন্যও সতর্কবার্তা


অতিবৃষ্টি ও জলাধারে পানির চাপ বাড়ায় মাইথন-পাঞ্চেত ও মুকুটমণিপুর থেকে পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত; সরাসরি বাংলাদেশে বন্যার আশঙ্কা নয়, তবে আন্তঃসীমান্ত নদী ও আবহাওয়া পরিস্থিতি নজরে রাখার পরামর্শ

ডেস্ক রিপোর্ট

অতি ভারী বৃষ্টি এবং উজানের জলাধারগুলোতে পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। দামোদর ভ্যালি করপোরেশন (DVC) মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে বিপুল পরিমাণ পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সময়ে বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুরের কংসাবতী বাঁধ থেকেও পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া, হুগলি, বাঁকুড়া ও পূর্ব বর্ধমানের দামোদর-তীরবর্তী নিচু এলাকায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মুণ্ডেশ্বরী ও রূপনারায়ণ নদীর তীরবর্তী এলাকাকেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

মাইথন-পাঞ্চেত থেকে বিপুল পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত

ডিভিসি জানিয়েছে, জলাধারের ক্যাচমেন্ট এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত এবং ঝাড়খণ্ডের তেনুঘাট বাঁধ থেকে পানিপ্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধারে পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে দামোদর ভ্যালি রিজার্ভয়ার রেগুলেটিং কমিটি বা DVRRC মাইথন ও পাঞ্চেত থেকে পানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতিবেদনে মাইথন-পাঞ্চেত মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কিউসেক পানি ছাড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী পরে পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।

পানি ছাড়ার সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। দামোদরের নিম্ন অববাহিকার নিচু এলাকায় সম্ভাব্য প্লাবন মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

কংসাবতী বাঁধেও বাড়ানো হয়েছে পানি ছাড়া

একই সময়ে বাঁকুড়ার মুকুটমণিপুর বাঁধ থেকেও পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়িয়েছে কংসাবতী কর্তৃপক্ষ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০ হাজার কিউসেক পানি ছাড়া হলেও পরদিন তা বাড়িয়ে ১৫ হাজার কিউসেক করা হয়। কংসাবতীর উচ্চ অববাহিকায় অব্যাহত বৃষ্টির কারণে বাঁধে পানির চাপ বাড়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে পানি ছাড়ার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কংসাবতী জলাধারের নকশাগত স্পিলওয়ে ডিসচার্জ ২ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক এবং প্রকল্পটির বিশাল সেচ কমান্ড এলাকা রয়েছে। অর্থাৎ অতিরিক্ত বৃষ্টির সময়ে জলাধারের পানি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব এলাকায় প্লাবনের আশঙ্কা

কংসাবতী থেকে পানি ছাড়ার কারণে পশ্চিম মেদিনীপুরের বিনপুর, দাসপুর, ডেবরা ও পাঁশকুড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে ডিভিসির পানি দামোদর অববাহিকার নিচু এলাকায় পৌঁছালে হাওড়া, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান ও পশ্চিম বর্ধমানের নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে ডিভিসি downstream এলাকাগুলোতে বন্যা সতর্কতাও জারি করেছিল।

বাংলাদেশের ওপর সরাসরি প্রভাব কতটা?

এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—মাইথন, পাঞ্চেত বা কংসাবতী বাঁধ থেকে ছাড়া পানি সরাসরি কোনো আন্তঃসীমান্ত নদীপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করে না।

দামোদর ও কংসাবতী অববাহিকার পানি পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। ফলে এই নির্দিষ্ট পানি ছাড়কে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সরাসরি বন্যা হবে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার ভিত্তি নেই।

তবে বিষয়টি পুরোপুরি বাংলাদেশের জন্য অপ্রাসঙ্গিকও নয়।

বাংলাদেশের নদী পরিস্থিতি ভারতের উজানাঞ্চলের বৃষ্টিপাত ও পানি প্রবাহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা নিজেই ভারতের উজানের কিছু স্টেশন থেকে পানির উচ্চতার তথ্য গ্রহণ করে এবং সেই তথ্য বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস মডেলে ব্যবহার করে।

বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সঙ্গে ভারতের ৫৭টি আন্তঃসীমান্ত নদীর সম্পর্ক রয়েছে এবং গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালের চুক্তিও রয়েছে।

অতএব, DVC-কংসাবতীর পানি ছাড়ের চেয়ে একই সময়ে বৃহত্তর পূর্ব ভারত ও গঙ্গা অববাহিকায় অতিবৃষ্টি, নদীর পানি বৃদ্ধি এবং ফারাক্কা-গঙ্গা-পদ্মা ব্যবস্থার পরিস্থিতিই বাংলাদেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয়।

বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য ঝুঁকি কোথায়?

১. একই সময়ে অতিবৃষ্টি

যদি পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একই সময়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়, তাহলে বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।

২. গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার চাপ

গঙ্গা অববাহিকায় অতিরিক্ত পানি এবং ফারাক্কা অঞ্চলের নদী পরিস্থিতি বাংলাদেশের পদ্মা অববাহিকায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই DVC-এর পানি ছাড়ার খবরের পাশাপাশি ফারাক্কা ও গঙ্গার পানি পরিস্থিতি আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

৩. একাধিক নদীর সম্মিলিত প্রভাব

বাংলাদেশের বন্যা সাধারণত একটি মাত্র উৎসের কারণে হয় না। উজানের পানি, স্থানীয় বৃষ্টি, নদীর ধারণক্ষমতা, ভাটির পানি নিষ্কাশন এবং বিভিন্ন নদীর পানি একই সময়ে বেড়ে গেলে ঝুঁকি দ্রুত বাড়তে পারে।

৪. পূর্বাভাসের সময়সীমা

বাংলাদেশের FFWC বর্তমানে নদীর পানি ও বৃষ্টিপাতের তথ্য ব্যবহার করে বিভিন্ন মেয়াদের পূর্বাভাস দেয়। কিন্তু উজানের তথ্য যত আগে পাওয়া যায়, বাংলাদেশের পূর্বাভাসের সময়সীমা ও নির্ভুলতা তত উন্নত করা সম্ভব। FFWC নিজেই উল্লেখ করেছে যে ভারতীয় সীমান্তের upstream water-level boundary পূর্বাভাসের সময়সীমাকে সীমিত করে।

বাংলাদেশের এখন কী প্রস্তুতি নেওয়া উচিত?

১. DVC নয়, পুরো অববাহিকা পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশের উচিত শুধু “DVC পানি ছাড়ছে” এমন খবরের ওপর নির্ভর না করে দামোদর–গঙ্গা–ফারাক্কা–পদ্মা অববাহিকার সম্মিলিত পানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা।

২. ভারতের কাছ থেকে রিয়েল-টাইম তথ্য চাওয়া

পানি ছাড়ার পরিমাণ, সময়, জলাধারের বর্তমান ধারণক্ষমতা এবং downstream নদীর সম্ভাব্য প্রবাহ সম্পর্কে দ্রুত তথ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

FFWC ইতোমধ্যে ভারতের Central Water Commission (CWC) থেকে সীমিত upper-catchment water-level data গ্রহণ করে। এই তথ্য আদান-প্রদানকে আরও দ্রুত, নিয়মিত ও স্বয়ংক্রিয় করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

৩. ফারাক্কা ও পদ্মাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা-পদ্মা প্রবাহ আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে ১৯৯৬ সালের পানি বণ্টন চুক্তিসহ সংশ্লিষ্ট নথি রয়েছে।

৪. সীমান্তবর্তী নদীতে আগাম সতর্কতা

রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুরসহ পদ্মা অববাহিকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নদীর পানি দ্রুত বাড়লে স্থানীয় প্রশাসনকে আগাম সতর্ক করার ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে হবে।

৫. FFWC-এর তথ্যকে মাঠপর্যায়ে দ্রুত পৌঁছানো

FFWC বর্তমানে নদীর পানি, বৃষ্টিপাত ও পূর্বাভাসের ভিত্তিতে সতর্কতা প্রদান করে এবং ২৪ থেকে ১২০ ঘণ্টার বিভিন্ন পূর্বাভাস তৈরি করে। এই তথ্য ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে দ্রুত পৌঁছে দিতে স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও মোবাইলভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

৬. নদীতীরবর্তী মানুষের প্রস্তুতি

যেসব এলাকায় পদ্মা বা অন্যান্য সীমান্তবর্তী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে, সেখানে আগাম আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত, নৌযান প্রস্তুত রাখা, জরুরি খাদ্য ও ওষুধ মজুত এবং নদীভাঙনপ্রবণ পরিবারগুলোর তালিকা হালনাগাদ রাখা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

বর্তমান DVC ও কংসাবতী বাঁধের পানি ছাড়কে সরাসরি বাংলাদেশের বন্যার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটিকে বৃহত্তর পূর্ব ভারতীয় বৃষ্টিপাত ও নদী ব্যবস্থার একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

বাংলাদেশের জন্য আসল নজর হওয়া উচিত—ফারাক্কা ও গঙ্গার পানি, পদ্মার প্রবাহ, সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি, উজানের বৃষ্টিপাত এবং আগামী কয়েক দিনের আবহাওয়া পূর্বাভাস।

FFWC-এর বর্তমান ব্যবস্থায় রিয়েল-টাইম নদী তথ্য ও বন্যা সতর্কতা পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে DVC ও কংসাবতী জলাধার থেকে পানি ছাড়ার ঘটনা মূলত অতিবৃষ্টি ও জলাধারের পানির চাপ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় বন্যা পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বন্যার কারণ না হলেও একই বৃহত্তর আঞ্চলিক বর্ষণ পরিস্থিতি যদি গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকাতেও তীব্র হয়, তাহলে বাংলাদেশের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই আতঙ্ক নয়—আগাম তথ্য, আন্তঃসীমান্ত পানি-তথ্য বিনিময়, ফারাক্কা-পদ্মা পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় দুর্যোগ প্রস্তুতিই বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিক্রিয়া।

Post a Comment

0 Comments