ঢাকা | অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের বাজারে গরুর মাংসের উচ্চমূল্য ও সরবরাহ সংকট রেস্তোরাঁ ব্যবসার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে—এমন দাবি করেছে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি। পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্দিষ্ট নীতিমালা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি তদারকির আওতায় সীমিত পরিসরে গরুর মাংস আমদানির অনুমতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর পুরানা পল্টনের ফার্স হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে চরম সংকটে রেস্তোরাঁ খাত, সংকট নিরসনের দাবিতে’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। এতে লিখিত বক্তব্য দেন সংগঠনের মহাসচিব ইমরান হাসান। উপস্থিত ছিলেন সভাপতি শাহ সুলতান খোকনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা।
কেজি ৮০০–১,০০০ টাকা, সরবরাহও কম—মালিক সমিতির দাবি
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে গরুর মাংসের দাম প্রতি কেজি ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত। তাদের দাবি, এই দামে রেস্তোরাঁগুলোর জন্য নিয়মিত ও মানসম্মত মাংস সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে চাহিদার তুলনায় সরবরাহও কম।
ইমরান হাসানের বক্তব্য অনুযায়ী, গরুর মাংস রেস্তোরাঁর অন্যতম প্রধান উপকরণ। দাম বেড়ে যাওয়ায় খাবার তৈরির খরচ বাড়ছে। কিন্তু সেই বাড়তি ব্যয় পুরোপুরি খাবারের দামে যুক্ত করলে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে অনেক রেস্তোরাঁ বাড়তি ব্যয়ের চাপ নিজেদের ওপরই বহন করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, বাজারে কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা দরের মাংসের একটি অংশে হাড়, চর্বি ও অন্যান্য অংশের পরিমাণ বেশি থাকায় প্রকৃত মাংসের পরিমাণ তুলনামূলক কমে যায়। এতে রেস্তোরাঁর প্রকৃত খাদ্য-উপকরণ ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে।
গোখাদ্যের দাম ও পশুপালন নিয়েও উদ্বেগ
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি শুধু মাংসের বাজার নয়, গবাদিপশু উৎপাদনের ব্যয় নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, আগে দেশের অনেক প্রান্তিক কৃষক ও খামারি সীমিত পরিসরে কয়েকটি করে গরু পালন করতেন। কিন্তু গোখাদ্য ও অন্যান্য পশুপালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকের পক্ষে আগের মতো গরু পালন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
গোখাদ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের কারণে দাম বাড়ছে—এমন অভিযোগও করেছেন সমিতির মহাসচিব। তবে এটি সংগঠনটির অভিযোগ; বাজারে মূল্যবৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ ও সিন্ডিকেটের ভূমিকা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
কেন সীমিত আমদানির দাবি?
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির প্রস্তাব হলো—সরাসরি উন্মুক্তভাবে নয়, বরং নির্দিষ্ট নীতিমালা ও কঠোর সরকারি তদারকির আওতায় সীমিত পরিসরে গরুর মাংস আমদানির সুযোগ দেওয়া।
সংগঠনটির যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক কম দামে মাংস সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হলে সরবরাহ বাড়তে পারে এবং বাজারদরের ওপর চাপ কমতে পারে। এতে রেস্তোরাঁগুলোও অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়ে খাবার প্রস্তুত করতে পারবে।
তবে আমদানি চালু হলে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি, মাংসের মান, উৎস দেশের প্রাণিস্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং আমদানিকৃত মাংসের সঠিক সংরক্ষণ ও পরিবহন নিশ্চিত করতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রয়োজন হবে—এ বিষয়টিও সংগঠনটি তাদের দাবির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
পাঁচ তারকা হোটেলের উদাহরণ
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির বক্তব্য, দেশের পাঁচ তারকা হোটেল ও কিছু বিশেষায়িত রেস্তোরাঁ ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানি করে। তাদের মতে, নির্দিষ্ট শর্ত ও মান নিয়ন্ত্রণের আওতায় অন্যান্য রেস্তোরাঁকেও সীমিত আমদানির সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
তবে বড় হোটেল বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের আমদানি ব্যবস্থাকে ছোট ও মাঝারি রেস্তোরাঁর জন্য একইভাবে প্রয়োগ করতে হলে আমদানি সক্ষমতা, কোল্ড-চেইন, সংরক্ষণ, শুল্ক এবং মান নিয়ন্ত্রণের বাস্তব সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।
শুধু মাংস নয়, বেড়েছে প্রায় সব পরিচালন ব্যয়
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির দাবি, তাদের সংকট শুধু গরুর মাংসের দামে সীমাবদ্ধ নয়।
চাল, ডাল, তেল, মাংস, মাছ, মসলা, শাকসবজি ও ডিমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি গ্যাস, বিদ্যুৎ, এলপিজি, পানি, দোকানভাড়া, পরিবহন ও শ্রমিকের মজুরি—প্রায় সব পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
অন্যদিকে এসব বাড়তি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খাবারের দাম বাড়ানোও সবসময় সম্ভব হচ্ছে না। কারণ খাবারের দাম বাড়লে ক্রেতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সমিতির হিসাবে, এই পরিস্থিতিতে রেস্তোরাঁগুলোর সামগ্রিক বিক্রি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এটি সংগঠনটির দেওয়া হিসাব; স্বাধীনভাবে পুরো খাতের বিক্রি কমার হার যাচাই করার জন্য আরও বিস্তৃত শিল্পভিত্তিক তথ্য প্রয়োজন।
৯ দফা দাবিতে যা আছে
সংকট মোকাবিলায় সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি মোট ৯ দফা দাবি তুলে ধরে।
দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
রেস্তোরাঁ ব্যবসা পরিচালনায় দ্রুত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু।
দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে খাবারের দাম সমন্বয়ে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ বন্ধ।
ভ্যাট আদায়ে হয়রানি বন্ধ এবং ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক ও ২ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহার।
এলপিজি ও জ্বালানি সংকটের সমাধান এবং লোডশেডিং কমানো।
বিভিন্ন দপ্তরের অভিযানের নামে হয়রানি ও অহেতুক আর্থিক জরিমানা বন্ধ।
রেস্তোরাঁ খাতকে শিল্প ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং সুনির্দিষ্ট শিল্পনীতি প্রণয়ন।
গরুর মাংস আমদানির অনুমতি দেওয়া।
ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ট্যাগ দিয়ে হয়রানি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
রেস্তোরাঁকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা এবং খাতটিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করার উদ্যোগ।
ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি রেস্তোরাঁ পরিচালনায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তর থেকে ১০–১২টি অনুমোদন নিতে হয়। তাদের দাবি, এই বহুমুখী অনুমোদন ব্যবস্থা সময় ও ব্যয় বাড়ায় এবং ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি কার্যকর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থাপনাকেও জটিল করে।
সংগঠনটি তাই একটি সমন্বিত কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার আওতায় অনুমোদন ও তদারকি এনে ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর দাবি জানিয়েছে।
এলপিজি সংকটও বড় চাপ
রেস্তোরাঁ খাতে রান্নার জন্য জ্বালানি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচালন ব্যয়। সমিতির দাবি, এলপিজির সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি তাদের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সংগঠনটি বাণিজ্যিক ব্যবহারকারীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, এলপিজির বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের বিরুদ্ধে বাজার তদারকি জোরদারের দাবি জানিয়েছে।

0 Comments