তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তের ছেলের ওপর চীনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে নজরদারি চালানোর অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ওই নারী চীনের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধনহীন বিদেশি এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন।
গ্রেপ্তার হওয়া নারীর নাম ওয়ানইং ঝাং, যিনি ‘হেদার’ নামেও পরিচিত। ৩৪ বছর বয়সী ঝাং ক্যালিফোর্নিয়ার আরভিনের বাসিন্দা। রোববার (৪ অক্টোবর) লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চীনের উদ্দেশে বিমানে ওঠার আগে তাকে গ্রেপ্তার করে এফবিআই।
চীনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে নজরদারির অভিযোগ
মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঝাং চীনা কর্মকর্তাদের নির্দেশে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটলে যান। সেখানে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের ছেলে ও তার পরিবারের ওপর নজরদারি চালানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ওই অভিযানে প্রেসিডেন্টের ছেলের বাড়ি, গাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়। পাশাপাশি গাড়ির নম্বরপ্লেটের তথ্যও চীনা কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এফবিআইয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, ঝাং নজরদারির কার্যক্রম গোপন রাখতে বিশেষ কৌশল ব্যবহার করেছিলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে বিদেশি সরকারের হয়ে কাজ করার বিষয়টি নিবন্ধন করেননি।
সিয়াটলে গিয়ে নজরদারির অভিযোগ
মার্কিন ফেডারেল অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঝাং ও আরও এক ব্যক্তি লাস ভেগাস থেকে সিয়াটলে যান। সেখানে তারা একটি গাড়ি ভাড়া করে লক্ষ্যবস্তুর বাড়ির কাছে যান।
প্রতিবেশীর নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজের বরাতে তদন্তকারীরা দাবি করেছেন, ওই নারী ও তার সহযোগী পরিবারটির বাড়ির সামনে অবস্থান করে ছবি বা ভিডিও ধারণ করছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র পরে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে লাই চিং-তের ছেলে লাই টিং-ইউর নাম উল্লেখ করে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঝাং চীনা মেসেজিং অ্যাপ উইচ্যাটের মাধ্যমে চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তদন্তকারীরা তার আইক্লাউড অ্যাকাউন্টে তল্লাশির মাধ্যমে এসব যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন বলে মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
কেন নজরদারি করা হয়েছিল?
মার্কিন তদন্তকারীদের মতে, তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ পরিবারের সদস্যদের অবস্থান, বাড়ি ও গাড়ির তথ্য চীনা কর্তৃপক্ষের জন্য সম্ভাব্যভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ফেডারেল অভিযোগে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত বা রাজনৈতিক সংকট তৈরি হলে এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা গোয়েন্দা কার্যক্রমে কাজে লাগতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যা মার্কিন তদন্তকারীদের মূল্যায়ন—এটি কোনো আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
বিমানবন্দরেই গ্রেপ্তার
ঝাংকে গ্রেপ্তার করা হয় যখন তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চীনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মার্কিন কর্মকর্তারা তাকে বিদেশি সরকারের নিবন্ধনহীন এজেন্ট হিসেবে কাজ করার অভিযোগে আটক করেন।
তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় আদালত বিষয়টি বিবেচনা করবে। সোমবার লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ফেডারেল আদালতে তার হাজির হওয়ার কথা ছিল বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তাইওয়ানের তীব্র প্রতিক্রিয়া
ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়। দেশটির পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ‘ট্রান্সন্যাশনাল রিপ্রেশন’ বা সীমান্তের বাইরে রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় মার্কিন কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে এবং ঘটনাটিকে মানবাধিকার ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।
চীনের সঙ্গে তাইওয়ান ইস্যুতে নতুন উত্তেজনা
ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন তাইওয়ানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র। তাইওয়ান নিজেদের পৃথক রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও পরিচয় বজায় রাখে; অন্যদিকে বেইজিং তাইওয়ানকে চীনের অংশ হিসেবে দাবি করে।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে ও তার ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টি তাইওয়ানের স্বতন্ত্র পরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারের ওপর জোর দেয়। এ অবস্থান বেইজিংয়ের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক বিরোধের অন্যতম কারণ।
অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি
ঝাংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বর্তমানে মার্কিন ফেডারেল আদালতের আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। এখন পর্যন্ত আদালতের চূড়ান্ত রায়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি।
ফলে তাকে ‘চীনা গুপ্তচর’ হিসেবে চূড়ান্তভাবে অভিহিত করার পরিবর্তে চীনের হয়ে নজরদারি চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার—এই ভাষাই সাংবাদিকতার দিক থেকে অধিক নির্ভুল। মামলার পরবর্তী শুনানি ও আদালতের সিদ্ধান্তেই অভিযোগগুলোর আইনগত অবস্থান স্পষ্ট হবে।

0 Comments