ঢাকা | জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এ সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, পানি নিরাপত্তা কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই পানি সংরক্ষণ, সেচব্যবস্থা, জলপথ ব্যবস্থাপনা এবং নদীভিত্তিক অবকাঠামোকে একই পরিকল্পনার আওতায় এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় কী থাকছে
তিস্তা নদী ও এর অববাহিকার দীর্ঘদিনের নদীভাঙন, বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি, নাব্যতা সংকট এবং কৃষি সেচের সমস্যাকে সামনে রেখে তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
সাম্প্রতিক সরকারি উদ্যোগ অনুযায়ী, মহাপরিকল্পনাটিকে বাস্তবায়নের দিকে নিতে কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অক্টোবরের শুরুতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এ কাজের জন্য ২৩ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় নতুন ব্যারাজ, নদীশাসন, ড্রেজিং, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সংরক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তা ও অর্থনৈতিক কার্যকারিতা মূল্যায়নের কথা রয়েছে।
এর আগে সংসদে দেওয়া তথ্যে বলা হয়েছিল, তিস্তা মহাপরিকল্পনার জরিপ সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় নদীতীর সংরক্ষণ, নদীশাসন ও ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অর্থাৎ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে সরকারের বর্তমান কার্যক্রমকে শুধু একটি নদী খনন প্রকল্প হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এটি নদী ব্যবস্থাপনা, পানি সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও আঞ্চলিক অর্থনীতিকে একসঙ্গে বিবেচনা করা একটি দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ হিসেবে এগোচ্ছে।
২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের লক্ষ্য
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে খাল ও জলপথের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক এলাকায় বর্ষায় পানি নিষ্কাশন, শুষ্ক মৌসুমে সেচ এবং স্থানীয় নৌযোগাযোগ—তিন ক্ষেত্রেই এসব জলপথ ব্যবহৃত হয়।
তবে এ ধরনের বৃহৎ কর্মসূচির কার্যকারিতা নির্ভর করবে খনন করা জলপথের পানি ধারণক্ষমতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দখল ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট নদী-খালের সঙ্গে কার্যকর সংযোগের ওপর।
শুধু খনন করলেই দীর্ঘমেয়াদে সুফল নিশ্চিত হবে না; খননের পর নাব্যতা ও প্রবাহ বজায় রাখার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পও পরিকল্পনার অংশ
পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সরকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পও এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
এর সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং খাল-জলপথ পুনঃখননের কর্মসূচিকে একই বৃহত্তর পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা যায়। লক্ষ্য হচ্ছে বর্ষার অতিরিক্ত পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষি সেচে পানির প্রাপ্যতা উন্নত করা।
তবে বড় পানি অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত পানিপ্রবাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। তাই প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন এবং কৃষিপণ্যের বাজারসংযোগ আরও সহজ করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি।
পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন হলে কৃষকের জন্য সেচের নিশ্চয়তা বাড়তে পারে, অতিরিক্ত পানিতে ফসলের ক্ষতির ঝুঁকি কমতে পারে এবং একই জমিতে ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকার কৃষি অর্থনীতি নদীর পানির প্রাপ্যতা ও মৌসুমি প্রবাহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে তিস্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এর প্রভাব শুধু নদী ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধ না থেকে কৃষি, মৎস্য, জীবিকা ও স্থানীয় বাজারেও পড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় গুরুত্ব
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি, খরা ও লবণাক্ততার মতো বিভিন্ন ঝুঁকির মুখোমুখি। এ পরিস্থিতিতে পানি সংরক্ষণ ও নদী ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তিস্তা মহাপরিকল্পনা, খাল ও জলপথ পুনঃখনন এবং পানি সংরক্ষণ প্রকল্পকে কৃষি সহায়তা ও জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের লক্ষ্য এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর কথাও জানিয়েছেন।

0 Comments