Header Ads Widget

Responsive Advertisement

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় সরকারি প্রণোদনা ব্যাহত: ডেপুটি স্পিকার


শুধু রাজনৈতিক সংস্কার যথেষ্ট নয়, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কার্যকর পরিবর্তনের আহ্বান; সরকারি সহায়তা জনগণের কাছে পৌঁছাতে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধের ওপর গুরুত্ব

জাতীয় ডেস্ক | নেক্সট নিউজ

শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কল্যাণে সরকার নানা ধরনের প্রণোদনা ও সহায়তা দিলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের কারণে সেসব সুবিধা যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সরকারি সেবা ও সহায়তার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর) আয়োজিত শরৎ উৎসব ও ৩১তম ব্যাচের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, দেশের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও অগ্রগতি নিশ্চিত করতে শুধু রাজনৈতিক সংস্কার যথেষ্ট নয়। আমলাতন্ত্র, বেসামরিক প্রশাসন, প্রকৌশল বিভাগসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম জনবান্ধব, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক না হলে সরকারের নীতি ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সুফল প্রত্যাশিত মাত্রায় মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে।

সরকারি প্রণোদনার সুফল পৌঁছাতে প্রশাসনিক বাধা দূর করার তাগিদ

সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তা কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, আর্থিক চাপ কমানো এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য এ ধরনের কর্মসূচি নেওয়া হলেও প্রশাসনিক জটিলতা অনেক সময় সেগুলোর কার্যকারিতাকে সীমিত করে দিতে পারে।

ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যে এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, সরকারি সেবা ও সহায়তা কার্যকরভাবে পৌঁছাতে প্রশাসনিক ব্যবস্থার সংস্কার জরুরি।

বাস্তবিক অর্থে, কোনো প্রণোদনা কর্মসূচির সফলতা শুধু অর্থ বরাদ্দ বা নীতিমালা প্রণয়নের ওপর নির্ভর করে না। কারা সুবিধা পাবেন, কীভাবে আবেদন করবেন, কত সময়ের মধ্যে সহায়তা দেওয়া হবে এবং অভিযোগ জানালে কীভাবে তার সমাধান হবে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আবেদন যাচাইয়ে দীর্ঘসূত্রতা, একাধিক দপ্তরের অনুমোদন, অস্পষ্ট নিয়ম এবং প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব থাকলে উপকারভোগীদের ভোগান্তি বাড়তে পারে। তাই সরকারি সহায়তা কার্যকর করতে নীতিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাস্তবায়নব্যবস্থাকে সহজ ও স্বচ্ছ করার প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারও জরুরি। তাঁর বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে আরও সুশৃঙ্খল করার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে আসে।

একটি রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব কোনো কর্মসূচি গ্রহণ করলেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দক্ষতা, সমন্বয় এবং দায়িত্বশীলতার ওপর তার বাস্তব ফলাফল নির্ভর করে।

এ কারণে প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত সেবা প্রদানের সময় কমানো, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, দায়িত্ব নির্ধারণ করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

তবে সংস্কার বলতে শুধু কাঠামো পরিবর্তন বোঝায় না। কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, কাজের মূল্যায়ন, নাগরিকদের সঙ্গে আচরণ এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন

সরকারি কাজে অপ্রয়োজনীয় অনুমোদন, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ফাইল স্থানান্তরের কারণে সেবা পেতে বিলম্ব হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। ব্যবসা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নাগরিক সেবা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই এ ধরনের জটিলতা সময় ও অর্থের অপচয় ঘটাতে পারে।

ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার এনে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, আবেদন ও অনুমোদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা, অনলাইনে আবেদনের অগ্রগতি জানার ব্যবস্থা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

একই সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কোনো আবেদন অযৌক্তিকভাবে আটকে থাকলে তার কারণ জানা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমাধান পাওয়ার সুযোগ থাকলে নাগরিকদের ভোগান্তি কমতে পারে।

দেশ গঠনে সরকারি দল ও বিরোধী দলের যৌথ দায়িত্ব

নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন এবং নাগরিকদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন ডেপুটি স্পিকার। তিনি বলেন, দেশ গঠনে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারি দলের দায়িত্বের মধ্যে নীতি প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং সরকারের কার্যক্রম বাস্তবায়ন অন্যতম। অন্যদিকে বিরোধী দলের ভূমিকা হলো সরকারের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা, বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা।

এ দুই পক্ষের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কার্যকর বিতর্ক এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কারের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা গুরুত্বপূর্ণ।

সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ছায়া মন্ত্রিসভার প্রসঙ্গ

সরকারের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ছায়া মন্ত্রিসভা বা ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ একটি পরিচিত সংসদীয় ধারণা। ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্যের বিষয়ে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে সরকারের জবাবদিহি জোরদার করতে এ ধরনের কাঠামো গঠনের পরামর্শের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

ছায়া মন্ত্রিসভা সাধারণত বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত হয়। এতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যবেক্ষণ, নীতির সমালোচনামূলক মূল্যায়ন এবং বিকল্প নীতিগত প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব নির্দিষ্ট সদস্যদের ওপর দেওয়া হতে পারে।

তবে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সংসদীয় কাঠামোয় এ ধরনের ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর করা হবে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত এবং প্রযোজ্য সংসদীয় রীতিনীতির ওপর নির্ভর করবে। এ প্রসঙ্গটি প্রশাসনিক জবাবদিহি ও সংসদীয় তদারকি নিয়ে চলমান আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের জন্য শুধু নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করাই যথেষ্ট নয়; সেসব কর্মসূচির সুফল যেন প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, সেবার সময়সীমা নির্ধারণ এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সরকারি প্রণোদনাকে বাস্তব জনকল্যাণে রূপ দেওয়া সম্ভব।

Post a Comment

0 Comments