বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ—একটি নাম, যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জাতীয় স্বার্থ এবং ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক সহিংসতার আলোচনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে নির্মম নির্যাতনে নিহত হন ২১ বছর বয়সী এই তরুণ। তার মৃত্যুর সাত বছর পরও হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলেও আসামিদের আপিলের কারণে মামলাটি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন।
আজ ৭ অক্টোবর ২০২৬, আবরার ফাহাদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার পরিবার আবারও দ্রুত চূড়ান্ত বিচার ও রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছে। সাত বছর ধরে অপেক্ষা করা পরিবারটির কাছে এখন প্রশ্ন একটাই—আর কত অপেক্ষা?
কেন আবরার ফাহাদ হয়ে উঠেছিলেন আলোচিত?
আবরার ছিলেন বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন, ৫ অক্টোবর ২০১৯, তিনি ফেসবুকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, পানি ও জ্বালানি-সংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে সমালোচনামূলক বক্তব্য প্রকাশ করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার ওই পোস্টকে কেন্দ্র করেই তাকে হলে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও নির্যাতন করা হয়েছিল।
এখানেই আবরার ফাহাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তৈরি হয়।
তার বক্তব্যকে অনেকে দেখেছেন বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সাহসী অবস্থান হিসেবে। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে পানির ন্যায্য হিস্যা, জ্বালানি, সীমান্ত ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান কতটা শক্তিশালী হওয়া উচিত—আবরারের পোস্ট সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছিল।
তবে তার রাজনৈতিক মতাদর্শকে সরলীকরণ না করে বলা যায়, তিনি অন্তত ওই পোস্টে বাংলাদেশের স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতীয় নীতির সমালোচনা করার অধিকার প্রয়োগ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই অবস্থানই তাকে অনেকের কাছে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে দাঁড়ানো এক প্রতীকী তরুণে পরিণত করে।
মতের জবাব কি নির্যাতন হতে পারে?
আবরার হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা এখানেই।
কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক মত, রাষ্ট্রীয় নীতি নিয়ে সমালোচনা কিংবা প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে চুক্তির বিরোধিতা—এসবের জবাব হতে পারে যুক্তি, তথ্য ও রাজনৈতিক বিতর্ক।
কখনোই শারীরিক নির্যাতন বা হত্যা নয়।
হাইকোর্টের রায়ে আবরার হত্যাকাণ্ডকে পূর্বপরিকল্পিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডটি হঠাৎ কোনো সংঘর্ষের ফল ছিল না; আগের একটি সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তাকে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল।
এই বিচারিক পর্যবেক্ষণ আবরার হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি ক্যাম্পাস-সহিংসতার ঘটনা নয়, বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক নজির হিসেবেও সামনে আনে।
সেই রাতের নির্মমতা
২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে আবরারকে বুয়েটের শেরেবাংলা হলের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে দীর্ঘ সময় ধরে মারধর করা হয়। পরে হলের সিঁড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ময়নাতদন্তে তার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায় এবং অতিরিক্ত মারধরের কারণে গভীর অভ্যন্তরীণ জখমের কথা চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন।
ঘটনার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক আধিপত্য, হলের নির্যাতন, র্যাগিং এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্ক শুরু হয়।
পরবর্তী সময়ে বুয়েটে সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাপক আলোচনায় আসে।
সাত বছরেও কেন শেষ হয়নি বিচার?
আবরার হত্যা মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ ২০ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
এরপর মৃত্যুদণ্ডের অনুমোদনের জন্য মামলাটি হাইকোর্টে যায়। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন—২০ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।
কিন্তু এখানেই বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়নি।
দণ্ডিত আসামিদের কয়েকজন হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও লিভ টু আপিল করেছেন। ফলে মামলাটি এখন আপিল বিভাগে বিচারাধীন এবং চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক প্রস্তুত হলেও মামলাটি এখনো আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় শুনানির জন্য ওঠেনি বলে সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান কী?
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানিয়েছেন, আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হলে রাষ্ট্রপক্ষ কোনো ধরনের বিলম্ব বা মুলতবি চাইবে না।
তিনি আবরার হত্যাকাণ্ডকে তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সহিংসতার একটি চরম উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং দ্রুত বিচার শেষ করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের এই অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আবরার হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করা শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়—এটি বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার প্রভাবের ঊর্ধ্বে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরীক্ষাও।
পরিবারের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি
আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে মামলাটি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে আসছেন। পরিবারের প্রত্যাশা, আপিল বিভাগে দ্রুত শুনানি সম্পন্ন করে চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ করা হবে।
অন্যদিকে আবরারের মা এখনো ছেলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, বই ও অন্যান্য স্মৃতি আঁকড়ে ধরে আছেন। সাত বছর পরও পরিবারের কাছে সময় থেমে আছে সেই ২০১৯ সালের রাতটিতে।
আবরার: একজন শিক্ষার্থী থেকে জাতীয় প্রতীকে
আবরার ফাহাদের মৃত্যু বাংলাদেশের তরুণ সমাজের মধ্যে একটি ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছিল—দেশের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কোথায়?
তার সমালোচনার বিষয় ছিল প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বিভিন্ন চুক্তি ও সম্পর্কের কিছু দিক। কিন্তু তার মৃত্যুর পর বিষয়টি আরও বিস্তৃত হয়ে যায়।
প্রশ্ন ওঠে—
বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করবে কে?
প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা কতটা?
পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ও জ্বালানির ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ কীভাবে নিশ্চিত হবে?
রাষ্ট্রীয় নীতির সমালোচনা করলে একজন নাগরিক কতটা নিরাপদ?
বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক মতের ভিন্নতা কি সহিংসতার কারণ হতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোই আবরার ফাহাদকে তার ব্যক্তিগত জীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি জাতীয় বিতর্কের প্রতীকে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশের স্বার্থে আবরার ফাহাদের উত্তরাধিকার
বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের স্বার্থে আবরার ফাহাদের ঘটনাকে শুধু ভারতবিরোধিতা হিসেবে সীমাবদ্ধ করা ঠিক হবে না। বরং এর মূল শিক্ষা হলো—বাংলাদেশের সঙ্গে যেকোনো রাষ্ট্রের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে।
ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। একই সঙ্গে পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ঘাটতি, নদী ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে। ফলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেও এসব বিষয়ে বাংলাদেশের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ নিয়ে দৃঢ়ভাবে আলোচনা করা রাষ্ট্রীয় কূটনীতির স্বাভাবিক অংশ।
আবরারের উত্তরাধিকার থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে—কোনো দেশের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়, বরং বাংলাদেশের পক্ষে ন্যায্য অবস্থান।
এমন একটি বাংলাদেশ প্রয়োজন যেখানে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে নীরবতা থাকবে না; চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু সার্বভৌম সিদ্ধান্ত অন্যের হাতে যাবে না; যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান কিংবা অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু প্রতিটি সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশের স্বার্থ।
‘আধিপত্যবাদবিরোধী’ চেতনার অর্থ কী?
আবরারকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী’ নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে। এই পরিচয়টি তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এর অর্থ হওয়া উচিত বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা রক্ষা করা—কোনো জনগোষ্ঠী বা রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের প্রতি বিদ্বেষ নয়।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের স্বার্থে প্রকৃত আধিপত্যবিরোধী অবস্থান মানে হলো—
সমতার ভিত্তিতে কূটনীতি, ন্যায্য পানির হিস্যা, ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য, সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তা, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ সার্বভৌমত্ব।
এই জায়গা থেকেই আবরার ফাহাদের বক্তব্যকে আজ নতুন প্রজন্মের কাছে দেখা যেতে পারে।
এখন সবচেয়ে বড় দাবি—চূড়ান্ত বিচার
সাত বছর পর আবরার ফাহাদ হত্যার মামলায় নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের রায় হয়েছে। এখন বাকি আপিল বিভাগের চূড়ান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া।
অ্যাটর্নি জেনারেলও দ্রুত বিচার শেষ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকেও একই দাবি।
তাই সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীতে সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি হতে পারে—আইন অনুযায়ী দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি, পলাতক আসামিদের আইনের আওতায় আনা এবং চূড়ান্ত রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
আবরার ফাহাদের স্মৃতি তখনই সত্যিকার অর্থে সম্মানিত হবে, যখন বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হবে যেখানে কোনো তরুণ তার দেশের স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে ভয় পাবে না এবং কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে উঠতে দেবে না।
আবরারের প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত সহিংসতা নয়—যুক্তি, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের দৃঢ় প্রতিষ্ঠা।

0 Comments