ডেস্ক রিপোর্ট
দেশে পরিকল্পিত ও সুষম নগরায়ণ নিশ্চিত করতে প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই নগর গড়ে তোলার পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, আবাসনকে শুধু একটি ভবন বা চার দেয়ালের আশ্রয় হিসেবে দেখলে হবে না; এর সঙ্গে নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং মর্যাদাপূর্ণ নাগরিক সেবার নিশ্চয়তাও যুক্ত।
প্রতিটি সিটি ও জেলায় সমন্বিত পরিকল্পনা
দ্রুত নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের বিভিন্ন শহরে যানজট, পরিবেশদূষণ, আবাসন সংকট, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও নাগরিক সেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারের পরিকল্পনায় প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলাকে নিজস্ব ভৌগোলিক, জনসংখ্যাগত, পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত বাস্তবতার আলোকে মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এর ফলে একটি এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প স্থাপনা কোথায় হবে, কোথায় সড়ক ও গণপরিবহন অবকাঠামো গড়ে উঠবে, কোথায় জলাধার ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করা হবে—এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
শুধু আবাসন নয়, নাগরিক সেবাকেও গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে আবাসনকে বৃহত্তর নাগরিক জীবনব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিরাপদ বাসস্থানের পাশাপাশি পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে দ্রুত নগরায়ণের ফলে বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা অনেক শহরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। মাস্টারপ্ল্যানের সঙ্গে এসব সেবা সমন্বিত করা গেলে ভবিষ্যতে নগর সম্প্রসারণের চাপ মোকাবিলা তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের আবাসনের ওপর গুরুত্ব
নগর উন্নয়নের পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে নিম্ন আয়ের মানুষ ও বস্তিবাসীদের আবাসনের মালিকানা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ ও স্থায়ী আবাসনের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে জমির প্রাপ্যতা, অর্থায়ন, পুনর্বাসন নীতি এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর।
৬ জেলায় পৃথক নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ
পরিকল্পিত নগরায়ণের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জে পৃথক নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে রাজধানীকেন্দ্রিক নগর উন্নয়নের বাইরে আঞ্চলিক শহরগুলোর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো উন্নয়নে আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
যানজট ও পরিবেশদূষণ মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা
শহরের আয়তন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি আবাসিক এলাকা, কর্মসংস্থান, সড়ক, গণপরিবহন ও নাগরিক সেবার মধ্যে সমন্বয় না থাকে, তাহলে নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে যানজট ও পরিবেশদূষণও বাড়তে পারে।
এ কারণে নতুন মাস্টারপ্ল্যানগুলোতে শুধু ভবন নির্মাণ নয়, সড়ক নেটওয়ার্ক, গণপরিবহন, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাধার সংরক্ষণ ও পরিবেশগত ভারসাম্য একসঙ্গে বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বিবেচনায়
বাংলাদেশের নগরগুলো জলাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জলবায়ুজনিত অভিবাসনের মতো বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও জলবায়ুজনিত অভিবাসনকে নগরায়ণের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ আগামী দিনের নগর পরিকল্পনায় শুধু বর্তমান জনসংখ্যার চাহিদা নয়, ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শহরে বাড়তে থাকা মানুষের চাপও বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আহ্বান
টেকসই আবাসন ও নগর উন্নয়ন কেবল সরকারের একার পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করে বেসরকারি খাত, এনজিও এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য হিসেবে গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমিয়ে মানবিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তোলার কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

0 Comments