যশোর | ডেস্ক রিপোর্ট
যশোর শহরের চাঁচড়া রাজবাড়ীসংলগ্ন ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দিরকে ঘিরে জমি, মন্দির পরিচালনা এবং দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী পরিবারগুলোর অবস্থান নিয়ে বিরোধ নতুন করে সামনে এসেছে। এরই মধ্যে মন্দির চত্বরে বসবাসকারী দশম শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রা ঘোষের মৃত্যুর ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মন্দিরের জায়গায় বসবাসকারী কয়েকটি পরিবারের অভিযোগ, মন্দিরের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে তাদের দীর্ঘদিনের বসবাসের জায়গা ছাড়তে চাপ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, মন্দির চত্বরের পুরো জায়গার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
তবে মন্দিরের অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মন্দিরটি দেবোত্তর সম্পত্তি এবং সেখান থেকে কাউকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়নি। শিপ্রার সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা তাকে মারধরের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।
শিপ্রার মৃত্যু ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে মন্দির চত্বরের একটি জরাজীর্ণ ঘর থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রী শিপ্রা ঘোষের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
ঘটনার পর শিপ্রার স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ ওঠে, মন্দির-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিরোধ ও কথিত হয়রানির কারণে মেয়েটি মানসিক চাপে ছিল। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে কারও অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়। যুগান্তরের প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের পক্ষ থেকেও ময়নাতদন্তের ফল এবং তদন্তের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
৮ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা
শিপ্রার মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর ভাই পাপন কুমার ঘোষ ২৭ সেপ্টেম্বর যশোরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় অনুপম রায় ওরফে অপার গোবিন্দ দাস, সাধন অধিকারী, রাম অধিকারী, অর্জুন দাস, পার্থ দাস, পবিত্র, সঞ্জয় ও রঘুর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে শিপ্রাকে উত্ত্যক্ত, যৌন হয়রানি, মারধর এবং শেষ পর্যন্ত হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার দিন বাড়িতে হামলা এবং শিপ্রার মাকে মারধরের পর তাকে ঘরের বাইরে বের করে দেওয়া হয় এবং শিপ্রার ওপর হামলা চালানো হয়।
এগুলো মামলার এজাহারে উত্থাপিত অভিযোগ—আদালতে প্রমাণিত অপরাধ নয়। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে। আদালত এ ঘটনায় থানায় কোনো মামলা হয়েছে কি না, তা জানিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশও দিয়েছেন।
ছয় পরিবারের উচ্ছেদের অভিযোগ
দশমহাবিদ্যা মন্দিরের জায়গায় বর্তমানে ছয়টি পরিবার বসবাস করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, তারা কয়েক প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করে আসছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্দির এলাকায় নতুন ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রম জোরদার হওয়ার পর থেকে পরিবারগুলোকে জায়গা ছাড়ার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঐতিহাসিক মন্দিরটির জায়গায় আরও বড় পরিসরে ধর্মীয় স্থাপনা ও কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনার কারণে বসবাসকারী পরিবারগুলোর অবস্থান নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিপরীতে মন্দিরের অধ্যক্ষের বক্তব্য হলো—মন্দিরের জায়গা থেকে কাউকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করা হয়নি। যশোর কোতোয়ালি থানার ওসিও যুগান্তরকে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।
ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দির
দশমহাবিদ্যা মন্দিরটি যশোরের পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর একটি। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, চাঁচড়ার রাজবংশের সঙ্গে মন্দিরটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জড়িত। রাজা শুকদেব রায় ও রাজা শ্যামসুন্দর রায়ের সময়কালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের দিকে ইসকনের অনুসারীরা মন্দিরের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন। এরপর সময়ের সঙ্গে মন্দিরের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
মানবাধিকার সংগঠনের অনুসন্ধান
ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোর পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ওই দলে চিকিৎসক, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের রাখা হয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিপ্রার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, মন্দিরের পরিবেশ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগের বিপরীতে মন্দির কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
মন্দিরের অধ্যক্ষ অপার গোবিন্দ দাস অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মন্দিরটি দেবোত্তর সম্পত্তি এবং কোনো পরিবারকে সেখান থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা হয়নি। শিপ্রার সঙ্গে কোনো ধরনের কটু আচরণ বা মারধরের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেছেন।
ঘটনার পর তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে মন্দিরের কার্যক্রম চালু রাখার জন্য নতুন ব্যক্তিরা সেখানে আসছেন বলেও জানা গেছে।

0 Comments