জাতীয় ডেস্ক | ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রধান এই তেল শোধনাগারের বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা বর্তমান ১৫ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাবে—অর্থাৎ সক্ষমতা হবে বর্তমানের তিনগুণ।
জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা
চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি বাংলাদেশের একমাত্র সরকারি তেল শোধনাগার। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে দেশে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
তবে দেশের জ্বালানি তেলের চাহিদা বাড়লেও রিফাইনারিটির পরিশোধন সক্ষমতা দীর্ঘ সময় ১৫ লাখ টনেই সীমিত ছিল। ফলে দেশের প্রয়োজনের বড় একটি অংশ পরিশোধিত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। নতুন সম্প্রসারণের ফলে এই নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্পে অর্থায়ন প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা
‘Modernization and Expansion of Eastern Refinery in Bangladesh’ প্রকল্পে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা আইডিবি ১,০০৪.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ সরকার ও আইডিবির মধ্যে প্রকল্পটির অর্থায়ন চুক্তি ২০২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব রয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ওপর।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোনো একক প্রকল্পে আইডিবির এটি সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই সম্প্রসারণ?
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার তুলনায় দেশীয় পরিশোধন সক্ষমতা অনেক কম। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করতে পারে। বাকি চাহিদা পূরণে পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি করতে হয়।
সক্ষমতা ৪৫ লাখ টনে উন্নীত হলে দেশে অপরিশোধিত তেল এনে বেশি পরিমাণে পরিশোধনের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম তুলনামূলক কম থাকলে তা আমদানি করে দেশে পরিশোধনের সুবিধা বাড়বে।
কমতে পারে পরিশোধিত তেল আমদানির চাপ
প্রকল্পটির অন্যতম প্রত্যাশিত সুফল হলো পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো। দেশে বেশি পরিমাণে জ্বালানি তেল পরিশোধন করা সম্ভব হলে বিদেশ থেকে প্রস্তুত জ্বালানি পণ্য কেনার প্রয়োজন কমতে পারে।
এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামার প্রভাব মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
ইউরো-৫ মানের জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ
আধুনিকায়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উন্নতমানের ও পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ মানসম্পন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা।
আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিশোধন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জ্বালানি পণ্যের মান উন্নত হলে দেশের পরিবহন ও শিল্প খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শুধু আমদানি কমানো নয়, বাড়বে মজুত সক্ষমতাও
ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট ও সম্প্রসারণ নিয়ে সরকারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পৃথক প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ থেকে ৪৫ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে দেশে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের পাশাপাশি জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়ও বাড়তি সক্ষমতা তৈরি হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
দেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব
ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা তিনগুণ করা হলে এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিশোধিত তেলের আমদানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে পরিশোধন কার্যক্রম বাড়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনার সম্ভাবনাও রয়েছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দামের পার্থক্য এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বিবেচনায় দেশে পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এক নজরে
বর্তমান সক্ষমতা: ১৫ লাখ মেট্রিক টন/বছর
প্রস্তাবিত সক্ষমতা: ৪৫ লাখ মেট্রিক টন/বছর
সক্ষমতা বৃদ্ধি: ৩ গুণ
আইডিবি অর্থায়ন: ১,০০৪.২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
বাংলাদেশি মুদ্রায়: প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা
বাস্তবায়নকারী: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)
প্রধান লক্ষ্য: জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি, আমদানি নির্ভরতা কমানো ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়
প্রত্যাশিত প্রযুক্তিগত সুবিধা: ইউরো-৫ মানের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন

0 Comments