যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত এবার নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালির কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে পালটাপালটি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা গত ছয় মাসের সংঘাতে সমুদ্রপথে দুই পক্ষের সবচেয়ে বড় হামলা হিসেবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে—আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে।
হরমুজের কাছে ১০ জাহাজে হামলার দাবি ইরানের
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির কাছে ১০টি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। ফলে বাণিজ্যিক জাহাজকে ঘিরে দুই দেশের সরাসরি পালটাপালটি হামলা আরও তীব্র হয়েছে।
নাবিক নিহত, একজন নিখোঁজ
হামলার ঘটনায় একটি ট্যাংকারে থাকা অন্তত একজন নাবিক নিহত হয়েছেন। আরেকজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। জর্ডানের দাবি, তাদের বাহিনী ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত করেছে। আরও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র জনবসতিহীন এলাকায় পড়েছে এবং এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
আরও বড় পালটা হামলার হুঁশিয়ারি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আরও হামলা হলে পালটা জবাবের মাত্রা ব্যাপকভাবে বাড়ানো হবে।
একই সঙ্গে সমুদ্রে নতুন একটি বড় নিষিদ্ধ এলাকা নির্ধারণের ঘোষণাও দিয়েছে আইআরজিসি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই এলাকার মানচিত্র শিগগির প্রকাশ করা হবে এবং নিষিদ্ধ অঞ্চলটি পাকিস্তানের উপকূলের কাছাকাছি চাবাহার পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
পাঁচ ট্যাংকার হারানোর দাবি যুক্তরাষ্ট্রের
ইকুয়েডর সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, সংঘাতের গতিপথ পরিবর্তন করার মতো কোনো বাহ্যিক সামরিক বা কৌশলগত সহযোগিতা ইরান পাচ্ছে না।
রুবিওর বক্তব্য অনুযায়ী, গত রাতে ইরান আরও পাঁচটি ট্যাংকার হারিয়েছে। এর মধ্যে চারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি সাগরে ডুবে গেছে।
তেলের বাজারে বড় ধাক্কা
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে উত্তেজনা শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত জুলাইয়ের পর এই প্রথম ব্রেন্টের দাম এই গুরুত্বপূর্ণ সীমা অতিক্রম করল।
হরমুজ প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। ফলে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নয়, বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা এবং নতুন সমুদ্র নিষিদ্ধ এলাকার ঘোষণা আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
এক নজরে
ঘটনাস্থল: হরমুজ প্রণালির আশপাশ
ইরানের দাবি: ১০টি জাহাজে হামলা
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা: ৫টি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার
নিহত: অন্তত ১ নাবিক
নিখোঁজ: ১ জন
জর্ডানে প্রতিহত: ১৮টি ক্ষেপণাস্ত্র
ব্রেন্ট তেল: ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি
নতুন হুঁশিয়ারি: বড় সমুদ্র নিষিদ্ধ এলাকা নির্ধারণের ঘোষণা
সামনে কী?
ছয় মাস ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে সমুদ্রপথে এই বড় ধরনের পালটাপালটি হামলা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় পড়তে পারে।
0 Comments