Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ভারতে ঐতিহাসিক মসজিদ উচ্ছেদ, তীব্র প্রতিবাদ ওয়াইসি-মাদানির


সাহারানপুরে ভোরে বুলডোজার অভিযান | ‘মুসলিম ধর্মীয় স্থানকে বেছে বেছে নিশানা’—অভিযোগ | প্রশাসনের দাবি, আদালতের আদেশেই উচ্ছেদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশটির বিশিষ্ট মুসলিম নেতারা। জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানি এবং এআইএমআইএম প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এ ঘটনার কঠোর সমালোচনা করেছেন।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ভোরে ভারী পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে সাহারানপুর জেলা প্রশাসন মসজিদটি উচ্ছেদ করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে জেলা প্রশাসনের দাবি, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে এই অভিযান চালানো হয়েছে।

ভোরের অভিযানে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় মসজিদ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাহারানপুর জেলা প্রশাসন শনিবার ভোরে মসজিদটি সরানোর অভিযান চালায়। অভিযানের সময় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিল।

ঘটনার পর স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এবং মসজিদটি নিয়ে আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।

মাদানির অভিযোগ—‘বুলডোজার হয়ে উঠেছে বিদ্বেষের হাতিয়ার’

জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানি এ ঘটনাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, বুলডোজার দিয়ে স্থাপনা ভাঙা এখন ন্যায়বিচারের পরিবর্তে প্রতিশোধ, পক্ষপাত ও বিদ্বেষের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি জমি বা জনস্থানে কোনো স্থাপনা অবৈধভাবে নির্মিত হলে তা উচ্ছেদের ক্ষেত্রে সব ধর্মের উপাসনালয়ের জন্য একই নিয়ম ও মানদণ্ড প্রয়োগ করা উচিত।

ওয়াইসির প্রশ্ন—ভোরে হঠাৎ অভিযান কেন?

এআইএমআইএম প্রধান ও হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসিও ঘটনাটির তীব্র সমালোচনা করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্ট এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে বক্তব্যে তিনি প্রশ্ন তোলেন, শনিবার ভোর ৫টার দিকে কেন হঠাৎ করে মসজিদটি উচ্ছেদের অভিযান চালানো হলো।

ওয়াইসির দাবি, মসজিদ কমিটিকে উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। তিনি এটিকে প্রাকৃতিক ন্যায়ের নীতির পরিপন্থী বলেও মন্তব্য করেন।

১৯১১ সালের নথিতে মসজিদের উল্লেখ থাকার দাবি

মসজিদ কমিটির বরাতে মাদানি ও ওয়াইসি দাবি করেছেন, ১৯১১ সালের সরকারি রেকর্ড, পৌরসভা এবং ভূমি রাজস্ব-সংক্রান্ত পুরোনো নথিতে মসজিদটির উল্লেখ রয়েছে।

তাদের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান কালেক্টরেট ভবন নির্মাণের আগেই একজন ব্যক্তির দান করা জায়গায় মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।

এটি ৪৫১ নম্বর রেজিস্ট্রিভুক্ত একটি ওয়াকফ সম্পত্তি বলেও তারা দাবি করেছেন। পাশাপাশি ১৯৯১ সালের Places of Worship Act এবং ‘Waqf by User’ নীতির আওতায় স্থাপনাটি আইনি সুরক্ষার যোগ্য ছিল বলে তাদের বক্তব্য।

প্রশাসনের বক্তব্য: ‘আইনি প্রক্রিয়া মেনেই উচ্ছেদ’

অন্যদিকে সাহারানপুর জেলা প্রশাসনের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মসজিদটি সরানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের দাবি, জুলাই মাসে সাহারানপুরের সিটি ম্যাজিস্ট্রেট মসজিদটিকে সরকারি জমির প্রায় ৩১৫ বর্গমিটার এলাকা দখল করে থাকা অবৈধ স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

এ ঘটনায় স্থাপনাটি সরানোর নির্দেশের পাশাপাশি প্রায় ৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয় বলে প্রশাসনের বক্তব্য।

জেলা আদালতে আবেদন খারিজের পর অভিযান

প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদ কমিটি সিটি ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশের বিরুদ্ধে জেলা আদালতে আবেদন করেছিল।

তবে সেই আবেদন আদালত খারিজ করার পর আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করতেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সাহারানপুর জেলা প্রশাসন।

ঘটনাকে ঘিরে উত্তেজনা

মসজিদ উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাহারানপুর এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

একদিকে মুসলিম নেতারা ঘটনাটিকে ধর্মীয় বৈষম্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করছেন; অন্যদিকে প্রশাসন বলছে, এটি সরকারি জমি দখলসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার অংশ

ফলে মসজিদটির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি জমির মালিকানা, ওয়াকফ সম্পত্তির মর্যাদা এবং আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন—এই তিনটি বিষয় এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।

এক নজরে

  • স্থান: সাহারানপুর, উত্তরপ্রদেশ, ভারত

  • স্থাপনা: ঐতিহাসিক মসজিদ

  • অভিযান: বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ

  • সময়: শনিবার ভোর

  • সমালোচনাকারী: আরশাদ মাদানি ও আসাদউদ্দিন ওয়াইসি

  • প্রশাসনের দাবি: সরকারি জমিতে অবৈধ দখল

  • দখলকৃত জমির দাবি: প্রায় ৩১৫ বর্গমিটার

  • জরিমানা: প্রায় ৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা

  • মসজিদ কমিটির দাবি: ঐতিহাসিক সরকারি নথিতে মসজিদের উল্লেখ রয়েছে

  • প্রশাসনের অবস্থান: আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে

বিতর্কের কেন্দ্রে দুটি ভিন্ন দাবি

এই ঘটনায় মূলত দুটি ভিন্ন বক্তব্য সামনে এসেছে। মুসলিম নেতাদের দাবি, ঐতিহাসিক ও ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে মসজিদটির আইনি সুরক্ষা ছিল এবং যথাযথ আইনি সুযোগ না দিয়েই অভিযান চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে সাহারানপুর প্রশাসনের দাবি, সরকারি জমিতে অবৈধ দখল হিসেবে চিহ্নিত করার পর আদালতের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই স্থাপনাটি সরানো হয়েছে।

ফলে মসজিদটির জমির আইনি অবস্থান, পুরোনো নথির বৈধতা এবং আদালতের আদেশের পূর্ণাঙ্গ বিষয়টি সামনে আসাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Post a Comment

0 Comments