বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধে নতুন রেকর্ড করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই—এই পাঁচ মাসে সরকার বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কোনো পাঁচ মাসের সময়সীমায় বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ পরিমাণ। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান বড় অংশের অর্থ পেয়েছে।
এক বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ১,৮৫০ কোটি টাকা
গত বছরের একই পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধ হয়েছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।
ইআরডির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ-জুলাই সময়ে পরিশোধ করা অর্থের মধ্যে ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার ছিল মূল ঋণ, আর ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার গেছে সুদ পরিশোধে।
হিসাব করলে পাঁচ মাসে সরকারের গড় মাসিক বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪১ কোটি ডলার।
কেন বাড়ছে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে আগের বছরগুলোতে নেওয়া বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসাকে সামনে আনা হয়েছে।
ইআরডির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ২৬৭ কোটি ডলার। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৩৭ কোটি ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪০৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ আরও বেড়ে ৪৪৯ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই বৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ।
পুরোনো প্রকল্পের ঋণ এখন বড় দায়
সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছিল।
তার দাবি, এসব ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল এবং ঋণের সুদের হার যথাযথভাবে বিবেচনার বিষয়টি সবসময় গুরুত্ব পায়নি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন দায়, ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভর্তুকিও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। এখন এসব পুরোনো দায়ের একটি বড় অংশ বর্তমান সরকারের সময়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে।
নতুন ঋণে সতর্ক অবস্থানের কথা সরকারের
অর্থনৈতিক উপদেষ্টা বলেন, সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দায়িত্ব নিয়েছে যেখানে পুরোনো দায় সামলানোর পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াও প্রয়োজন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে দেশি বা বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু অর্থের প্রয়োজনীয়তা নয়, সেই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ হবে, কী ধরনের অর্থনৈতিক রিটার্ন আসবে এবং কতটা কর্মসংস্থান তৈরি হবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ করে উৎপাদন ও ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে ঋণের অর্থ থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
একদিকে বড় অঙ্কের পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
নিয়মিত বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও ঋণদাতাদের কাছে বাংলাদেশের পরিশোধ সক্ষমতা এবং আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে সরকার।
তবে সামনে বিদেশি ঋণের কিস্তি আরও বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও নতুন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের ওপর এর কী প্রভাব পড়ে—সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

0 Comments