নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি
নরসিংদীর শিবপুরে সবজির চারা উৎপাদন ও বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন বহু কৃষক। উপজেলার বাঘাব ইউনিয়নের কুন্দারপাড়া এলাকা এখন শীতকালীন সবজির চারার অন্যতম বড় স্থানীয় বাজারে পরিণত হয়েছে। এখানকার উৎপাদিত চারা যাচ্ছে নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের কাছে।
একসময় শিবপুর ও আশপাশের এলাকার কৃষকদের শীতকালীন সবজি চাষের জন্য মুন্সীগঞ্জ থেকে চারা কিনতে হতো। প্রায় দুই দশক আগে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয় কৃষকরা পরীক্ষামূলকভাবে চারা উৎপাদন শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সেই উদ্যোগই এখন রূপ নিয়েছে লাভজনক কৃষি ব্যবসায়।
৩০ বিঘা জমিতে চারা উৎপাদন
স্থানীয় কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কুন্দারপাড়া এলাকায় বর্তমানে প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে সবজির চারা উৎপাদন হচ্ছে। এ খাতে বছরে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার চারা বেচাকেনা হয়। প্রায় ১৫০ কৃষক সরাসরি এ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি মৌসুমে আষাঢ় মাস থেকে শুরু হয় বীজতলা প্রস্তুত ও বীজ অঙ্কুরোদগমের কাজ। চলে আশ্বিন মাস পর্যন্ত। অর্থাৎ প্রায় চার মাসের মৌসুমে একই পলিথিনে মোড়ানো শেড ব্যবহার করে ৪ থেকে ৫ বার পর্যন্ত বীজ অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে চারা উৎপাদন করা সম্ভব।
বাঁধাকপি, ফুলকপি থেকে টমেটো—চাহিদা সব চারাতেই
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মৌসুমের শুরুতে বীজতলা প্রস্তুত করে বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, মরিচ ও টমেটোর বীজ বপন করা হয়। বীজ অঙ্কুরোদগমের পর চারার নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। প্রায় এক মাস বয়স হলে এসব চারা তুলে বিক্রি করা হয়।
বর্তমানে ভালো মানের প্রতিটি ফুলকপির চারা ৮০ পয়সা থেকে ১ টাকা এবং বাঁধাকপির চারা মানভেদে ৬০ থেকে ৮০ পয়সা দরে বিক্রি হচ্ছে।
দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন কৃষক
কুন্দারপাড়ার চারার চাহিদা শুধু নরসিংদীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা এখানে চারা কিনতে আসছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা, ফেনী, চাঁদপুর, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, নেত্রকোনা, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল থেকেও কৃষকরা এখানে চারা কিনতে আসেন।
ক্রেতা কৃষকদের অনেকেই জানান, কুন্দারপাড়া থেকে চারা নিয়ে জমিতে রোপণ করে ভালো ফলন পাওয়ায় তারা প্রতিবছর দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসেন।
মাঠজুড়ে পলিথিনের শেড, ব্যস্ত কৃষকরা
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের শিবপুর উপজেলার কুন্দারপাড়া বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে পলিথিনে মোড়ানো অসংখ্য বীজতলা।
কোথাও কৃষকরা চারা তুলছেন, কোথাও চলছে আগাছা পরিষ্কারের কাজ। আবার কোনো কোনো বীজতলার ওপরের পলিথিন খুলে দিয়ে চারাগুলোকে উন্মুক্ত করা হচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতারাও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন পছন্দের চারা সংগ্রহে।
‘চারা বিক্রি করে ভালো আছি’
শওকত আলী নার্সারির মালিক শওকত আলী বলেন, তিনি প্রায় ১৪ বছর ধরে চারা উৎপাদন ও বিক্রির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
তিনি বলেন, “দেড় বিঘা জমিতে অঙ্কুরোদগমের মাধ্যমে চারা উৎপাদন ও বিক্রি করে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ টাকা জমাতে পারছি। চারা বিক্রি করে আমরা ভালো আছি।”
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কুন্দারপাড়া এলাকায় প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে ১৫০ জনের মতো কৃষক চারা উৎপাদন করছেন। বছরে এখানে প্রায় দেড় কোটি টাকার চারা বেচাকেনা হয়।
এক বিঘা জমিতে লাখ টাকার বিনিয়োগ, লাভও উল্লেখযোগ্য
কুন্দারপাড়া গ্রামের কৃষক ফজলুল হক জানান, একসময় তারা মুন্সীগঞ্জ থেকে চারা এনে সবজি চাষ করতেন। সেখান থেকেই ধারণা নিয়ে স্থানীয়ভাবে চারা উৎপাদন শুরু করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ফুলকপির বীজ বপন থেকে চারা উৎপাদন পর্যন্ত প্রায় এক মাসে অন্তত এক লাখ টাকা খরচ হয়। এ সময়ে তিন লাখের বেশি চারা উৎপাদন করা সম্ভব হয়। আনুষঙ্গিক খরচ বাদ দিয়ে এসব চারা বিক্রি করে দুই লাখ টাকার বেশি আয় করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে তারা বিভিন্ন সময় প্রযুক্তি ও চারা উৎপাদনের বিষয়ে পরামর্শ পান।
কৃষি অফিসের সহযোগিতা ও পরামর্শ
শিবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিন সাদেক জানান, উপজেলার কুন্দারপাড়া এলাকায় প্রায় ৮ হেক্টর জমিতে সবজির চারা উৎপাদন করা হয়।
তিনি বলেন, সবজির নার্সারি একটি লাভজনক ব্যবসা। কৃষি বিভাগ চারা উৎপাদনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি চারার গুণগত মান বজায় রাখার বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে।
এ ছাড়া নতুন জাতের সবজি এবং আগাম সবজির চারা উৎপাদনের বিষয়েও কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার নাম কুন্দারপাড়া
একসময় যেখানে নিজেদের সবজি চাষের প্রয়োজন মেটাতেই চারা উৎপাদন শুরু হয়েছিল, আজ সেই কুন্দারপাড়া হয়ে উঠেছে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি চারা উৎপাদন কেন্দ্র।
স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা, চারার মান, ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ক্রেতাদের আগমন—সব মিলিয়ে শিবপুরের কুন্দারপাড়ায় সবজির চারা উৎপাদন এখন কৃষিভিত্তিক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

0 Comments