পাউরুটি-বিস্কুট-কেকের বাজারে নতুন চাপ, কাঁচামাল ও জ্বালানি সংকটে বিপাকে উদ্যোক্তারা
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) থেকে দেশের বিভিন্ন বেকারি পণ্যের দাম বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত। পাউরুটি, বিস্কুট, কেকসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাত ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, একদিকে আটা, ময়দা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো কাঁচামালের দাম বেড়েছে; অন্যদিকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও ঘন ঘন লোডশেডিং উৎপাদন ব্যাহত করছে। এতে বিশেষ করে ক্ষুদ্র বেকারি উদ্যোক্তারা বাড়তি চাপের মুখে পড়েছেন।
কেন বাড়ছে বেকারি পণ্যের দাম?
বেকারি মালিকদের মতে, গত কয়েক মাসে উৎপাদনের প্রধান কাঁচামালের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
টিসিবির তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছয় মাসে খুচরা বাজারে খোলা ময়দার দাম প্রায় ৩০ শতাংশ, সয়াবিন তেল ৫ শতাংশ এবং চিনির দাম গড়ে ১১ শতাংশ বেড়েছে।
বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি—
খোলা চিনি: ১১০–১২০ টাকা
আটা: ৪৮–৫০ টাকা
ময়দা: ৬৫–৭০ টাকা
দরে বিক্রি হচ্ছে।
এক বছরে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয় ২০–২৫ শতাংশ
বেকারি উদ্যোক্তাদের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে ৫০ কেজির এক বস্তা ময়দার দাম প্রায় ২,৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩,১০০ টাকা হয়েছে।
একই সময়ে চিনির দাম বস্তাপ্রতি প্রায় ১,২০০ টাকা, ১৬ কেজির ডালডার কার্টন ৮০০ টাকা এবং ১৮৫ কেজির সয়াবিন তেলের ড্রাম প্রায় ৫,০০০ টাকা বেড়েছে।
সব মিলিয়ে গত এক বছরে বেকারি পণ্য উৎপাদনের খরচ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে আরও বিপাকে বেকারিগুলো
শুধু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি নয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহও বেকারি শিল্পের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনেক কারখানায় দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক নয়। ফলে কেউ কেউ নিয়মিত গ্যাসের পরিবর্তে সিলিন্ডারের এলপিজি ব্যবহার করছেন। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়ছে।
অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বৈদ্যুতিক ওভেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। প্রস্তুত করা কিছু পণ্য দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় নষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
কোথাও দৈনিক ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান
রাজধানীর একটি বেকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জানিয়েছেন, আগে দৈনিক ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করে সব খরচ বাদ দেওয়ার পর ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ থাকত।
বর্তমানে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। কোনো কোনো দিনে প্রায় ১৮ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার একটি বেকারিতেও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টার মধ্যে ৫–৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ওভেন ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে না।
৬ মাসে বন্ধ হতে পারে শত শত ছোট বেকারি
বাংলাদেশ ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতির হিসাবে, দেশে ছোট বেকারির সংখ্যা প্রায় ৭ হাজার। এর মধ্যে ঢাকাতেই রয়েছে ৭০০টির বেশি প্রতিষ্ঠান।
এই শিল্পে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন লক্ষাধিক মানুষ।
উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী ছয় মাসে দেশের ৫০০ থেকে ৬০০টি ছোট বেকারি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সব পণ্যে কি ২০ শতাংশ দাম বাড়বে?
না। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম সরাসরি ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে না।
কিছু পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। আবার কোনো কোনো পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রেখে প্যাকেটের ওজন কমিয়ে উৎপাদন ব্যয় সমন্বয় করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
ফলে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে পণ্যের ধরন ও ব্র্যান্ডভেদে বাজারদরে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| দাম বাড়ার সম্ভাব্য সময় | ১২ সেপ্টেম্বর |
| সর্বোচ্চ মূল্যবৃদ্ধি | ২০% |
| ময়দার দাম বেড়েছে | প্রায় ৩০% (৬ মাসে) |
| উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে | ২০–২৫% (এক বছরে) |
| দেশে ছোট বেকারি | প্রায় ৭,০০০ |
| ঢাকায় | ৭০০+ |
| সম্ভাব্য বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা | ৫০০–৬০০ প্রতিষ্ঠান |
ভোক্তাদের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
পাউরুটি, বিস্কুট ও কেকসহ বেকারি পণ্য বাংলাদেশের দৈনন্দিন খাদ্যবাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার সঙ্গে দাম সমন্বয় হলে এর প্রভাব সরাসরি ভোক্তার দৈনন্দিন ব্যয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমান উৎপাদন ব্যয়ে আগের দামে পণ্য সরবরাহ করা তাদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
শেষ কথা
কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, গ্যাস সংকট ও লোডশেডিং—তিন দিকের চাপে বেকারি শিল্প এখন কঠিন সময় পার করছে। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন দামে পণ্য বাজারে এলে কোন পণ্যের দাম কতটা বাড়ছে, তা ব্র্যান্ড ও পণ্যের ধরন অনুযায়ী স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে সরকারি সহযোগিতার দাবিও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
0 Comments