নিজস্ব প্রতিবেদক | দিনাজপুর
দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। স্থানীয়ভাবে কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা নিয়ে একদিকে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন সামনে এসেছে, অন্যদিকে ২০০৬ সালের আন্দোলনের স্মৃতি ও স্থানীয় মানুষের জমি, বসতভিটা, কৃষি এবং ভূগর্ভস্থ পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।
সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন বক্তব্য এবং ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে মতবিনিময় ও বিতর্কও বাড়ছে।
জাতীয় স্বার্থে কয়লা, তবে অগ্রাধিকার স্থানীয় জনগণের স্বার্থে—সরকারের বক্তব্য
প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফুলবাড়ীসহ দেশের অন্যান্য খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা দেশের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করার কথা বলেছেন।
বিশেষ করে কয়লা উত্তোলনের আগে স্থানীয় জনগণের স্বার্থ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হলে বসতবাড়ি ও কৃষিজমির ওপর প্রভাব পড়তে পারে—এ বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে।
২০০৬ সালের আন্দোলনের স্মৃতি এখনো গুরুত্বপূর্ণ
ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন নিয়ে ২০০৬ সালে বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছিল। ওই আন্দোলনে হতাহতের ঘটনাও ঘটে।
খনিবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত পরিবেশকর্মীদের আশঙ্কা, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন হলে কৃষিজমি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
তাদের পক্ষ থেকে ২০০৬ সালের আন্দোলনের পর করা ছয় দফা চুক্তির বিষয়টি সামনে রেখে নতুন করে কয়লা উত্তোলনের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার বিরোধিতা করা হয়েছে।
স্থানীয় মানুষের অবস্থান কি বদলেছে?
প্রতিবেদনটিতে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে এমন কিছু মত উঠে এসেছে যে, ন্যায্য ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং পরিকল্পিত নগরায়ন নিশ্চিত করা হলে জাতীয় প্রয়োজনে কয়লা উত্তোলন নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা করা যেতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির মালিকদের ন্যায্য মূল্য দেওয়ার পাশাপাশি নতুন আবাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।
অর্থাৎ স্থানীয় মানুষের একটি অংশের মূল দাবি শুধু ‘খনি হবে কি হবে না’—এতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং খনি হলে তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠছে।
বড়পুকুরিয়া খনি থেকে কী শিক্ষা?
ফুলবাড়ীর পাশেই রয়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি। ওই খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা ব্যবহার করে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, বড়পুকুরিয়া এলাকায় কয়লা উত্তোলনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে এবং অনেক পরিবার পরবর্তীতে অন্যত্র বসতি স্থাপন করেছে।
এ অভিজ্ঞতাকে ফুলবাড়ীর সম্ভাব্য কয়লা উত্তোলনের ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। তবে দুই এলাকার ভূগোল, প্রকৃতি, জনবসতি ও প্রকল্পের ধরন এক নয়—তাই যেকোনো সিদ্ধান্তের আগে পৃথক পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
কয়লা আমদানিতে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ?
প্রতিবেদনটিতে জ্বালানি খাতের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কয়লা আমদানির ওপর নির্ভরতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
দেশে নির্মাণাধীন ও চালু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার ৩২৯ মেগাওয়াট বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের জন্য বছরে প্রায় ৩৩.৬ মিলিয়ন টন কয়লা প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যদিকে, বড়পুকুরিয়া থেকে বছরে প্রায় ১ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে দেশীয় উৎস থেকে পর্যাপ্ত কয়লা না পাওয়া গেলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন সমীকরণ
জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে দেশীয় গ্যাস, কয়লা ও অন্যান্য জ্বালানি সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলনের বিষয়টি আবারও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় এসেছে।
ফুলবাড়ীর ক্ষেত্রে তাই প্রশ্নটি শুধু একটি কয়লা খনি চালু করা না করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে—
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ
কয়লা আমদানির ব্যয়
স্থানীয় জনগণের পুনর্বাসন
কৃষিজমি ও পানিসম্পদ
পরিবেশগত ঝুঁকি
কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতি
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আস্থার সংকট
ফুলবাড়ীর কয়লা নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় মানুষের আস্থা অর্জন।
সরকার যদি জাতীয় স্বার্থে দেশীয় কয়লা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে স্বচ্ছ আলোচনা, স্বাধীন পরিবেশগত মূল্যায়ন, ক্ষতিপূরণের কাঠামো, পুনর্বাসন পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, শুধু বিরোধিতার পরিবর্তে স্থানীয় জনগণের উদ্বেগ ও জাতীয় জ্বালানি প্রয়োজন—দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজার পক্ষেও মত রয়েছে।
এখন যে প্রশ্নগুলো সামনে
ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন হলে স্থানীয় মানুষ কতটা লাভবান হবেন?
কৃষিজমি ও ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষতি হলে তার দায় কে নেবে?
ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কীভাবে নিশ্চিত হবে?
দেশীয় কয়লা ব্যবহার করলে আমদানি ব্যয় কতটা কমতে পারে?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা ও ফুলবাড়ীর মানুষের স্বার্থের মধ্যে কীভাবে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য তৈরি করা যাবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কার্যকর সংলাপই ফুলবাড়ীর কয়লা উত্তোলন নিয়ে ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

0 Comments