তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি বাড়াতে চায় সরকার, হংকংকে দেখা হচ্ছে নতুন বাণিজ্যদ্বার হিসেবে
তৈরি পোশাকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে পাট, চামড়া, তাজা ফলসহ উচ্চমূল্যের বহুমুখী পণ্য হংকংয়ের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে চায় বাংলাদেশ। একই সঙ্গে হংকংয়ের বড় ভোক্তা ও বাণিজ্যিক বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সরাসরি প্রবেশ এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) হংকং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে ১১তম বেল্ট অ্যান্ড রোড সামিটের সাইডলাইনে হংকং ট্রেড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক সোফিয়া চংয়ের সঙ্গে বৈঠকে এসব কথা বলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বাংলাদেশের বড় লক্ষ্য—রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য
বাংলাদেশ-হংকং বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতি রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৪১৫ মিলিয়ন ডলার।
এর মধ্যে বাংলাদেশ হংকং থেকে ৩০৭ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ১০৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।
পরবর্তী অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ বাংলাদেশের রপ্তানি সামান্য বেড়ে ১০৯ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তবে বাণিজ্য ঘাটতি এখনো উল্লেখযোগ্য।
আম, কাঁঠাল, লেবু যেতে পারে হংকংয়ের সুপারমার্কেটে
হংকংয়ের বাজারে বাংলাদেশের কৃষিপণ্যের প্রবেশ বাড়াতে আম, কাঁঠাল, লেবুসহ মানসম্পন্ন তাজা ফল সরাসরি সুপারমার্কেট ও বড় আমদানিকারকদের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ জন্য দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিজনেস-টু-বিজনেস (B2B) ম্যাচমেকিং আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশের উৎপাদক ও রপ্তানিকারকদের সঙ্গে হংকংয়ের আমদানিকারক ও খুচরা বিক্রেতাদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হতে পারে।
পাটপণ্যে নতুন সম্ভাবনা
শুধু কৃষিপণ্য নয়, হংকংয়ের পরিবেশবান্ধব ও সবুজ বাজারেও বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে।
বিশেষ করে—
বায়োডিগ্রেডেবল পণ্য
পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং
নকশাভিত্তিক পাটপণ্য
এসব খাতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধার প্রস্তাব
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রবেশ সহজ করতে হংকংয়ের বাণিজ্য মেলার প্রদর্শনীতে ভর্তুকিযুক্ত বা বিনামূল্যে স্টল দেওয়ার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যবসা সহজ করতে—
ইলেকট্রনিক সার্টিফিকেট অব অরিজিন,
আধুনিক শুল্ক প্রক্রিয়া,
যৌথ শিপিং ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা
উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্য প্রতিযোগিতায় হংকংকে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ
স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে।
এ লক্ষ্যে হংকংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সইয়ের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
মন্ত্রী হংকংকে দক্ষিণ চীন ও গ্রেটার বে এরিয়ার বাজারে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনার কথাও জানান।
বিনিয়োগেও হংকং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার
শুধু পণ্য রপ্তানি নয়, বাংলাদেশে হংকংয়ের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে হংকং থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এর মধ্যে শুধু ২০২৫ সালেই এসেছে প্রায় ১২২ মিলিয়ন ডলার।
বর্তমানে হংকং বাংলাদেশের বিদেশি বিনিয়োগের সপ্তম বৃহত্তম উৎস বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উচ্চপ্রযুক্তি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি—বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র
হংকংয়ের উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য তৈরি পোশাক ও বস্ত্রের বাইরেও বিভিন্ন খাতের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সম্ভাবনাময় খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে—
উচ্চপ্রযুক্তি
সবুজ প্রযুক্তি
নবায়নযোগ্য জ্বালানি
হালকা প্রকৌশল
জুতা শিল্প
তথ্যপ্রযুক্তি
এ ছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় বিশেষ সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
একদিন আগেই বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি
হংকংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুই পক্ষের মধ্যে বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা চুক্তি (IPPA) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর লক্ষ্য দুই দেশের বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ও পুঁজির সুরক্ষা বাড়ানো এবং পারস্পরিক বিনিয়োগের পরিবেশকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করা।
এক নজরে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ২০২৪-২৫ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য | ৪১৫ মিলিয়ন ডলার |
| বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি | ১০৮ মিলিয়ন ডলার |
| হংকং থেকে আমদানি | ৩০৭ মিলিয়ন ডলার |
| ২০২৫-২৬ রপ্তানি | ১০৯.৫১ মিলিয়ন ডলার |
| গত ৫ বছরে হংকংয়ের বিনিয়োগ | প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার |
| ২০২৫ সালে বিনিয়োগ | প্রায় ১২২ মিলিয়ন ডলার |
| বাংলাদেশে হংকংয়ের বিনিয়োগ অবস্থান | ৭ম বৃহত্তম উৎস |
কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর। ফলে পাট, চামড়া, কৃষিপণ্য, প্রযুক্তি ও সবুজ পণ্যের নতুন বাজার তৈরি হলে রপ্তানি আয়ের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হতে পারে।
অন্যদিকে হংকংকে দক্ষিণ চীন ও গ্রেটার বে এরিয়ার বাজারে প্রবেশের সেতু হিসেবে ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেষ কথা
হংকংয়ের বাজারে বাংলাদেশি ফল, পাট, চামড়া ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের পণ্য প্রবেশ করানো এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হতে পারে। বিশেষ করে LDC-পরবর্তী সময়ে নতুন বাজার ও বিনিয়োগ উৎস তৈরি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
0 Comments