ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে ৫ শতাধিক শিশু বাবা-মাকে হারিয়েছে কিংবা তাদের স্বজন নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের প্রায় চার সপ্তাহ পরও এসব শিশুর অনেকেই জানে না তাদের পরিবারের সদস্যরা কোথায়। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শিশুদের সামনে এখন তৈরি হয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
নেপালের বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকায় সরকারি স্কুল ও অন্যান্য স্থাপনা অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। সেখানেই পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাওয়ার আশায় দিন কাটছে অনেক শিশুর।
৯ বছরের রামের অপেক্ষা
নুওয়াকোট জেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে আরও ২৬ শিশুর সঙ্গে রয়েছে ৯ বছর বয়সী রাম ঠাকুর।
২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যার দিন পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাম। এরপর প্রায় চার সপ্তাহ পার হলেও তার মা-বাবার কোনো খোঁজ পায়নি সে।
তবু রামের বিশ্বাস, তার মা-বাবা হয়তো তাকে খুঁজতে আসবেন।
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা একজন পরামর্শদাতা জানান, কাছাকাছি কোনো হেলিকপ্টার উড়তে দেখলেই রাম বাইরে ছুটে যায়। তার মনে হয়, হয়তো সেই হেলিকপ্টারেই তার মা-বাবাকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
বন্যার দিন কী ঘটেছিল রামের সঙ্গে?
২৬ আগস্ট সকালে মায়ের সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছিল রাম। সকাল প্রায় ৮টার দিকে হঠাৎ বন্যার পানি ও বিপদের খবর ছড়িয়ে পড়ে।
রামের বাবা তখন বাড়িতে ছিলেন। তিনি গাইড ও গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন এবং সাধারণত সকাল ১০টার দিকে কাজে বের হতেন।
বন্যার পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় রাম ও তার মা নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটতে শুরু করেন। একপর্যায়ে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাম। পরে আরও ১৩ জনের সঙ্গে একটি পাহাড়ে প্রায় একদিন আটকে থাকে সে।
শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তাদের উদ্ধার করা হয়।
রামের ভাষায়, সে সময় সে খুব ভয় পেয়েছিল এবং ক্ষুধার্ত ছিল। বন্যার পানিতে তার স্কুলব্যাগও ভেসে যায়। সেই ব্যাগে বিস্কুট ও খাবারের বাক্স ছিল।
‘মা-বাবা এখনো আমাকে নিতে আসেনি কেন?’
আশ্রয়কেন্দ্রে ডাল, ভাত ও শাক খাওয়ার সময় রাম জানায়, তার মা-বাবা এখনো তাকে নিতে আসেননি—এটা সে বুঝতে পারছে না।
তার ধারণা, মা-বাবা দুজনই সাঁতার জানতেন। তাই এতদিন পরও তারা ফিরে না আসায় তার মনে তৈরি হয়েছে গভীর অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা।
শতাধিক শিশুর সঙ্গে নেই কোনো স্বজন
নেপালের ন্যাশনাল চাইল্ড রাইটস কাউন্সিল ও বিভিন্ন শিশু অধিকার সংস্থার বন্যাপরবর্তী মূল্যায়নে দেখা গেছে, দেশটির অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ১ হাজারের বেশি শিশু রয়েছে।
এর মধ্যে শতাধিক শিশুর সঙ্গে বর্তমানে কোনো স্বজন নেই। আরও ৪৩৯ শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে না থাকলেও অন্য আত্মীয়দের সঙ্গে রয়েছে।
অর্থাৎ, বিপর্যয়ের পর শুধু ঘরবাড়ি হারানো নয়—অনেক শিশুর জন্য পরিবার ও নিরাপদ অভিভাবকত্বও বড় সংকটে পরিণত হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত ৩২ হাজারের বেশি শিশু
বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে ৩২ হাজারের বেশি শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এসব শিশুর পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করা এবং পুনর্মিলনের জন্য কাজ করছে।
এ পর্যন্ত ১৮ শিশুকে তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন করা সম্ভব হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
আইনগতভাবে ‘এতিম’ নয়, বাস্তবে বাবা-মাকে হারিয়েছে
নেপালের আইনে কোনো ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করার আগে সাধারণত দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে বিশেষ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ রয়েছে।
ফলে যেসব শিশুর বাবা-মা নিখোঁজ, তাদের অনেককেই আইনগতভাবে এখনই ‘এতিম’ ঘোষণা করা যাচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবে তারা বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে চলছে শিশুদের যত্ন
রাম যে আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে, সেখানে শিশুদের থাকার জন্য কয়েকটি কক্ষ প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে জলরোধী মাদুর, বিছানার সরঞ্জাম ও খেলনা রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য বাঙ্ক বেড তৈরির কাজও চলছে।
কেন্দ্রটির একটি কক্ষ খাদ্যসামগ্রী রাখার জন্য এবং আরেকটি রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নেপাল পুলিশের সদস্যদের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কর্মীরাও শিশুদের দেখাশোনায় যুক্ত রয়েছেন।
শিশুদের মানসিকভাবে সহায়তা দিতে পরামর্শদাতারাও কাজ করছেন।
পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ক্ষত শুধু ধ্বংস হওয়া ঘরবাড়ি কিংবা অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে শিশুদের নিয়ে—যাদের কেউ পরিবার হারিয়েছে, কেউ স্বজন হারিয়েছে, আবার কেউ এখনো অপেক্ষা করছে নিখোঁজ বাবা-মায়ের ফিরে আসার।
পরিবারের সদস্যদের শনাক্ত করা, নিখোঁজদের সন্ধান, শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং তাদের দ্রুত স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া—দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে এসব কাজই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

0 Comments