Header Ads Widget

Responsive Advertisement

শিশু নিখোঁজের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে: ৭ মাসে জিডি ১৫,৭১৭, এখনো নিখোঁজ ২,০৩৮


নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে শিশু নিখোঁজ ও অপহরণের ঘটনায় উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারাদেশের বিভিন্ন থানায় ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছে ২ হাজার ৩৮ শিশু।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর জিডি হয়েছে। এদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা গেলেও ৬৮ শিশু এখনো নিখোঁজ।

অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জিডি হয়েছে ১৫ হাজার ২৪৩টি। এদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরেছে। এখনো সন্ধান মেলেনি ১ হাজার ৯৭০ জনের।

‘জিডি নিয়েও সহযোগিতা মেলে না’—ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ

নিখোঁজ শিশুদের পরিবারের অনেকেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

সাবেক পুলিশ সদস্য নজরুল ইসলাম জানান, গত বছরের ২০ মে রাজবাড়ী থেকে তার শিশু সন্তান তামিম নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ ১৬ মাসেও তার সন্ধান মেলেনি। সাবেক পুলিশ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও সন্তানকে খুঁজে পেতে পুলিশের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি বলে অভিযোগ তার।

মিরপুর-১১ থেকে শিশু ইব্রাহিম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাতেও পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে শুরুতে জিডি নিতে গড়িমসির অভিযোগ করা হয়েছে। পরে জিডি নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরির পর তদন্ত ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে জানান শিশুটির বাবা।

নিখোঁজের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় দ্রুত পুলিশ, গণমাধ্যম, স্থানীয় প্রশাসন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া গেলে শিশুকে দ্রুত উদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়ে।

শুধু থানায় জিডি করার মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, প্রযুক্তিনির্ভর চাইল্ড ট্র্যাকিং ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন থানার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বস্তি ও পথশিশুদের বড় অংশ হিসাবের বাইরে

রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোর বস্তিতে বসবাসকারী অনেক শিশুর জন্মনিবন্ধন নেই। অনেকের মা-বাবা বা পরিবারের পরিচয়ও অনিশ্চিত। ফলে এসব শিশু হারিয়ে গেলে বা নিখোঁজ হলে তাদের অনেকের তথ্য পুলিশের পরিসংখ্যানেও উঠে আসে না।

অপরাধ ও সমাজবিজ্ঞান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিভাবকহীন ও পথশিশুদের জন্মনিবন্ধনের আওতায় আনা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

নেই পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডেটাবেস

নিখোঁজ শিশুদের বিষয়ে দেশে এখনো এমন কোনো একক পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডেটাবেস নেই, যেখানে নিখোঁজ, অপহৃত, পাচারের শিকার, উদ্ধার হওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ শিশুদের সমন্বিত তথ্য পাওয়া যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নিখোঁজের প্রকৃত কারণ, উদ্ধার পরিস্থিতি এবং নিখোঁজ হওয়ার ধরন বিশ্লেষণ করতে একটি সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেস ও রেসপন্স সিস্টেম প্রয়োজন।

পুলিশের বক্তব্য

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, শিশু নিখোঁজের বিষয়টি গুরুত্ব ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখার জন্য মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো থানার বিরুদ্ধে জিডি নিতে অনীহা বা অসহযোগিতার অভিযোগ পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, অনলাইন জিডির ব্যবস্থাও রয়েছে এবং শিশু নিখোঁজের ঘটনায় পরিবারের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজার, মেলা, পার্ক, বাসস্ট্যান্ড ও রেলস্টেশনের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুমের মতে, শিশু নিখোঁজ বা অপহরণের প্রতিটি ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে হবে। এর সঙ্গে জড়িত চক্র শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

অন্যদিকে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিখোঁজের পরপরই শিশুর ছবি, পরিচয় ও সর্বশেষ অবস্থানের তথ্য প্রচারের পাশাপাশি দ্রুত আন্তঃসংস্থা সমন্বয় করা গেলে বহু শিশুকে নিরাপদে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব।

শিশু নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনা তাই শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়—এটি জাতীয় শিশু নিরাপত্তার বড় একটি চ্যালেঞ্জ। দ্রুত প্রতিক্রিয়া, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, সমন্বিত তদন্ত এবং জনসচেতনতা বাড়ানোই হতে পারে এ সংকট মোকাবিলার গুরুত্বপূর্ণ পথ।

Post a Comment

0 Comments