বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান জানান, জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ সদস্যদের ভোটদানের স্বাধীনতা নিয়ে যে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছিল, সেটি বাস্তবায়িত না হওয়ায় তাঁদের দল এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে সংসদে
বৃহস্পতিবার দুপুর ২টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভোট গ্রহণ চলার কথা বিকেল ৫টা পর্যন্ত।
এই নির্বাচনে সংসদ সদস্যরাই ভোটার। ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের ২৫০ জন এবং বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৯০ জন সংসদ সদস্যের পাশাপাশি আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যও ভোটার হিসেবে রয়েছেন।
এর মধ্যে ইসলামী আন্দোলনের একমাত্র সংসদ সদস্য ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
জুলাই সনদের সঙ্গে বর্তমান ব্যবস্থার পার্থক্য নিয়ে আপত্তি
ইসলামী আন্দোলনের বক্তব্যের মূল কেন্দ্রে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হওয়া সমঝোতা।
দলটির দাবি, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে এমন একটি কাঠামোতে ঐকমত্য হয়েছিল, যেখানে আইনসভার উভয় কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবে বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি ছিল এবং এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো ভিন্নমতও জানানো হয়নি।
কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সেই সমঝোতার প্রতিফলন ঘটছে না বলে অভিযোগ করেছে ইসলামী আন্দোলন।
সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটের বিষয়টিও সামনে এনেছে দলটি
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছাড়াও সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিয়েও জুলাই সনদে ঐকমত্যের বিষয়টি তুলে ধরেছে ইসলামী আন্দোলন।
দলটির বিবৃতি অনুযায়ী, জুলাই সনদের সংশ্লিষ্ট ধারায় অর্থবিল ও আস্থাভোট ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছিল।
ইসলামী আন্দোলনের দাবি, এই বিষয়েও বিএনপিসহ সংশ্লিষ্ট দলগুলোর পক্ষ থেকে কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল না। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সেই নীতিও কার্যকর করা হয়নি।
রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়েও ব্যাখ্যা
ইসলামী আন্দোলন বলেছে, রাষ্ট্রপতির পদ সাংবিধানিকভাবে অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক হলেও জাতীয় সংকট ও বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনকালীন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
দলটির মতে, রাষ্ট্রপতি জাতীয় ঐক্য ও আস্থার প্রতীক হিসেবে কাজ করতে পারেন। বাংলাদেশের নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে অতীতে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ হিসেবে দলীয় পরিচয়ের রাষ্ট্রপতির বিষয়টিও তারা বিবেচনা করছে।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় নীতিগত সমঝোতা হয়েছিল বলে দাবি করেছে দলটি।
৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব তাঁর বিবৃতিতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
দলটির বক্তব্য হলো, বর্তমান ব্যবস্থায় সংসদ সদস্যদের দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই অনেকটা অনুমেয়। ফলে ভোট গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা কতটা অর্থবহ—সেই প্রশ্নও তুলেছে তারা।
ইসলামী আন্দোলনের মতে, জুলাই সনদের রাজনৈতিক সমঝোতা অনুসরণ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজন করা হলে সংসদীয় ভোটের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক চরিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারত।
নতুন করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান
বর্তমান প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ইসলামী আন্দোলন জুলাই জাতীয় সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নতুনভাবে আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে।
দলটির অভিযোগ, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না করে নির্বাচন আয়োজন করা হলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটি পূরণ হবে না।
এ কারণে দলটি বর্তমান নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।
মূল বিষয়
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলনের ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত মূলত জুলাই সনদের রাজনৈতিক ঐকমত্য বনাম বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো—এই বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি এবং সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ—এই দুটি বিষয় ভবিষ্যৎ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংস্কার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

0 Comments