Header Ads Widget

Responsive Advertisement

অরুণাচলে চীনের ‘গোপন দখলের’ অভিযোগ, টহল নিয়েও প্রশ্ন



আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অরুণাচল প্রদেশের দুর্গম সীমান্ত এলাকায় চীনের কথিত অনুপ্রবেশ ও ভূখণ্ড দখলের নতুন অভিযোগ ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের তথ্য-অনুসন্ধানী দলের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সীমান্তের কয়েকটি এলাকায় ভারতীয় সেনাদের নিয়মিত টহল ব্যাহত হচ্ছে এবং স্থানীয়দের ব্যবহৃত কিছু ভূমি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অরুণাচলের আপার সুবানসিরি জেলা ও তাকসিং এলাকা। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, প্রবল বৃষ্টি, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার কারণে বছরের একটি বড় সময়ে ওই অঞ্চলে সেনাবাহিনীর নিয়মিত চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কী দাবি করেছে তথ্য-অনুসন্ধানী দল?

অরুণাচল প্রদেশের পিপলস পার্টি অব অরুণাচল (পিপিএ) চার সদস্যের একটি দলকে ওই এলাকায় পাঠিয়েছিল বলে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাদের দাবি, স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সীমান্ত এলাকায় চীনা উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের তথ্য পাওয়া গেছে।

তথ্য-অনুসন্ধানী দলের বক্তব্য অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাকসিং অঞ্চলে ভারতীয় সেনাদের নিয়মিত টহল সীমিত হয়ে পড়ে। এই সুযোগে সীমান্তের ওপারে চীনা বাহিনী তুলনামূলকভাবে সক্রিয় থাকে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০২৩ সালে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় সেনারা শেরা-৫ নামে একটি টহল পয়েন্ট থেকে সরে যায়। তবে এসব দাবির স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।

স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ

তথ্য-অনুসন্ধানী দলের সদস্যদের দাবি, সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু স্থানীয় বাসিন্দা তাদের ঐতিহ্যগত শিকারক্ষেত্র ও চলাচলের এলাকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের অভিযোগ, সীমান্তে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে কয়েক বছর ধরে এসব সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

এর আগে স্থানীয় একটি উপজাতীয় সংগঠনও সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি দিয়ে সীমান্ত এলাকায় চীনা অনুপ্রবেশ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবস্থান

তবে চীনের কথিত ভূখণ্ড দখল নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগকে ভুল ও ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টিকে সরাসরি একই ভাষায় নাকচ না করে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। নয়াদিল্লির বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত পরিস্থিতি দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলে।

চীনের বক্তব্য কী?

চীনও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে চীন-ভারত সীমান্ত পরিস্থিতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক যোগাযোগ চালু রয়েছে। সাম্প্রতিক বৈঠকেও সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে দুই পক্ষের যোগাযোগ হয়েছে।

অরুণাচল কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

অরুণাচল প্রদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। চীন পুরো অরুণাচলকে নিজেদের দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ নামে অভিহিত করে। ভারত এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং অরুণাচলকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।

দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৩,৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। কিন্তু সীমান্তের বিভিন্ন অংশে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা LAC নিয়ে দুই দেশের অবস্থান এক নয়। ফলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় টহলদল মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

শুধু অরুণাচল নয়, একাধিক এলাকায় বিরোধ

ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনার ইতিহাস দীর্ঘ। লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ২০২০ সালের প্রাণঘাতী সংঘর্ষ দুই দেশের সম্পর্ককে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। সিকিমের নাকু লা, উত্তরাখণ্ডের বারাহোতি, হিমাচল প্রদেশের শিপকি লা এবং ভুটান-সংলগ্ন ডোকলাম এলাকাতেও বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তে ছোট কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও দ্রুত বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে। তাই সীমান্তে নিয়মিত যোগাযোগ ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা, তবু রয়ে গেছে অবিশ্বাস

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা দুই দেশকে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে উৎসাহিত করছে।

তবে সীমান্ত বিরোধের মতো মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধান এখনো হয়নি। ফলে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি হলেও দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অবিশ্বাস পুরোপুরি দূর হয়নি বলে বিশ্লেষকদের মত।

বাণিজ্য বাড়লেও ভারসাম্যহীনতা রয়েছে

সীমান্তে মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও ভারত ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৫১.১ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রায় ৭১.৪৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

তবে এই বাণিজ্যে ভারতের বড় ঘাটতি রয়েছে। চীন থেকে ভারতের আমদানি ভারতের চীনে রপ্তানির তুলনায় অনেক বেশি। অর্থাৎ অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়লেও বাণিজ্যিক ভারসাম্য এখনো নয়াদিল্লির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

সব মিলিয়ে, অরুণাচলকে ঘিরে নতুন অভিযোগ ভারত-চীন সীমান্তের পুরোনো সমস্যাকে আবারও আলোচনায় এনেছে। অভিযোগের সত্যতা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান ভিন্ন হলেও সীমান্তে শান্তি বজায় রাখা এবং সরাসরি সংঘাত এড়ানোই এখন দুই দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Post a Comment

0 Comments