দীর্ঘ ৩৫ বছর পর আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতি পদে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা। বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
এবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন দুজন। ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।
সংসদে দলীয় আসনের হিসাবে বিএনপির অবস্থান অনেক এগিয়ে থাকায় মির্জা ফখরুলের বিজয় প্রায় নিশ্চিত বলেই রাজনৈতিক ও সংসদীয় হিসাব-নিকাশে ধরা হচ্ছে। তবে একাধিক প্রার্থী থাকায় আইন অনুযায়ী ভোট গ্রহণ করতেই হচ্ছে।
ভোট দেবেন ৩৪৯ সংসদ সদস্য
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনসহ মোট আসন ৩৫০টি। তবে চট্টগ্রাম-৪ আসনের নির্বাচনী ফলাফল আদালতের নির্দেশনার কারণে এখনো ঘোষণা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটার হিসেবে রয়েছেন ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
এর মধ্যে বিএনপির সংসদ সদস্য ২৪৭ জন। দলটির মিত্র বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সদস্য রয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের মোট সংসদ সদস্য ৯০ জন। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর ৭৭ জন সদস্য রয়েছেন। জোটের অন্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও জাগপার প্রতিনিধিরাও রয়েছেন।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এবং আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছেন।
ভোট যেভাবে হবে
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট সাধারণ নির্বাচনের মতো গোপন ব্যালট নয়। সংসদ সদস্যরা ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নিজের পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন।
ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রথমে সংসদ সদস্যরা ব্যালট পেপারের মুড়ি অংশে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। এরপর মূল ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত জায়গায় আবার নাম লিখে স্বাক্ষর করে ভোট প্রদান করবেন।
সংসদ সদস্যরা তাঁদের নিজ নিজ আসনে বসেই ভোট দেবেন। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালও সংসদ সদস্য হিসেবে ভোটার। তাঁদের জন্য সংসদকক্ষে আলাদা আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রার্থীদের ভোটাধিকার
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেও সংসদ সদস্য হওয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দিন তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়ে যাবে।
অন্যদিকে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী অলি আহমদ সংসদ সদস্য নন। ফলে তিনি নিজে এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না।
ফল ঘোষণা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। সংসদের নিয়মিত অধিবেশন চলমান না থাকায় শুধু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য সংসদ সদস্যদের আলাদা বৈঠক ডাকা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভোট শুরুর সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার ও প্রধানমন্ত্রীর ভোটদান বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। এরপর সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ থাকবে। ভোট গণনার সময় আবার তা সম্প্রচার করা হবে।
গণনা শেষে সংসদকক্ষেই ফল ঘোষণা করবেন নির্বাচনী কর্তা। পরে নির্বাচনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
কেন এবার ভোটের প্রয়োজন হলো
বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোট দিতে হয়েছিল। সে নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হন।
এরপর পরপর সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় আর ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। এবার বিরোধী জোট প্রার্থী দেওয়ায় আবারও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর নির্বাচন
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। তাঁর পদত্যাগের ফলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। সংবিধান অনুযায়ী, পদ শূন্য হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন গত ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। নতুন রাষ্ট্রপতির শপথ আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন চিফ হুইপ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ফলাফলের সম্ভাব্য চিত্র আগেই অনেকটা স্পষ্ট হলেও, ৩৫ বছর পর আবার সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন হওয়ায় এবারের নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

0 Comments