বিএসইসি প্রতিষ্ঠার পর একসঙ্গে এতসংখ্যক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা এটিই প্রথম বলে জানা গেছে। গত মঙ্গলবার সংস্থাটির পক্ষ থেকে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং পরদিন অনেকে কমিশনের কার্যালয়ে গিয়ে চিঠি গ্রহণ করেন।
কেন নেওয়া হলো এই ব্যবস্থা
গত বছরের ৫ মার্চ বিএসইসির তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ কয়েকজন কমিশনারকে কয়েক ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ওই ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে ফৌজদারি মামলা, প্রশাসনিক তদন্ত এবং বিভাগীয় কার্যক্রম শুরু হয়। তদন্ত ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণের পর সরকারের পক্ষ থেকে মোট ২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ কমিশনে পাঠানো হয়।
এর মধ্যে একজন কর্মকর্তা আগেই অন্য একটি অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বাকি ২২ জনের বিরুদ্ধে এবার ব্যবস্থা নিয়েছে বিএসইসি—১৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং পাঁচজনকে বেতন কমানোর শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
সেই দিনের ঘটনায় কী হয়েছিল?
ঘটনার সূত্রপাত হয় বিএসইসির তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর প্রতিবাদে। ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।
৫ মার্চ একপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সভাকক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরে সেনাবাহিনীর সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাঁদের উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় বিএসইসিতে কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা ও অস্থির পরিস্থিতি বিরাজ করে।
কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তৎকালীন কমিশনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও দাবি তুলে ধরা হয়েছিল। পাশাপাশি ঘটনার প্রতিবাদে কর্মবিরতিও পালন করা হয়।
মামলাও হয়েছিল
অবরুদ্ধ ও নাজেহালের ঘটনায় পরদিন, অর্থাৎ ৬ মার্চ, রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি মামলা করা হয়। তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যানের নিরাপত্তায় নিয়োজিত একজন নিরাপত্তাকর্মী বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
মামলার পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রশাসনিক তদন্ত ও বিভাগীয় মামলা শুরু হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও তদন্ত পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এসব প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা আসে।
মামলার অভিযোগে কী বলা হয়েছিল
মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিএসইসির নির্ধারিত সভা চলাকালে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী অনুমতি ছাড়া সভাকক্ষে প্রবেশ করে চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অবরুদ্ধ করেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই সময় কমিশনের প্রধান ফটকে তালা দেওয়া, সিসিটিভি ক্যামেরা ও ওয়াই-ফাই সংযোগ বন্ধ করা, লিফট অচল করা এবং বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ঘটনা ঘটে। এতে কমিশন ভবনে ভীতিকর ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে মামলায় দাবি করা হয়।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় এর প্রভাব
বিএসইসি দেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান। শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানি, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান, মার্চেন্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন পক্ষের কার্যক্রম তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে সংস্থাটির ভূমিকা রয়েছে।
এ কারণে একসঙ্গে এত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর জনবল কাঠামো ও দায়িত্ব বণ্টনে পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এটি একটি নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে শাস্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত আইনগত অবস্থান এবং পরবর্তী কোনো আপিল বা প্রশাসনিক প্রতিকার নেওয়া হবে কি না—তা সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে।

0 Comments