রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘ক্ষমতাবান হলেও ছাড় নয়’
রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি তাঁকে পেতেই হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর বক্তব্যে গুম ও গোপন বন্দিশালার প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে থাকার আহ্বান
গুম শুধু একজন মানুষকে হারানোর ঘটনা নয়—এর প্রভাব পুরো পরিবারকে বহন করতে হয় বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, গুমের ঘটনায় পরিবারের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁর ভাষায়, এটি গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গুমের শিকার পরিবারগুলোর মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
‘প্রতিশোধ নয়, প্রতিকার’
গুম ও খুনের ঘটনায় জড়িতদের বিচারের ক্ষেত্রে প্রতিশোধের পরিবর্তে আইনি প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি বলেন, প্রকৃত অপরাধীদের আইনানুগভাবে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অতীতের ঘটনাগুলোর যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসামুক্ত বাংলাদেশের প্রত্যাশা
রাষ্ট্রপতি এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না।
তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, ভয়ভীতির পরিবেশ দূর করা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন।
যাঁদের স্মরণ করলেন রাষ্ট্রপতি
বক্তব্যে অতীতে গুমের শিকার হওয়া ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, সাজেদুল ইসলাম, সালাহউদ্দিন আহমদ, মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা স্মরণ করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, গুমের শিকার হয়েছেন ভিন্নমতাবলম্বী, কর্মকর্তা, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গৃহবধূসহ সাধারণ নাগরিকদেরও অনেকে।
শুধু শাস্তি নয়, পুনর্বাসনও জরুরি
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে আসে—অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়।
গুমের শিকার পরিবারগুলো যাতে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনরায় দাঁড়াতে পারে, সে জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁরা গুমের ঘটনাগুলোর যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান সভাপতিত্ব করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
মূল বার্তা
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে—
গুমের ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা
গুমের শিকার পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
ভবিষ্যতে ‘আয়নাঘর’ বা ভয়ভিত্তিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি বন্ধ করা
গুমের বিচার ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পাশাপাশি গুমের শিকার পরিবারগুলোও যথাযথ বিচার ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে।

0 Comments