Header Ads Widget

Responsive Advertisement

এডিস নিধনের ৬ মশানাশকের ৫টিই অকার্যকর, ডেঙ্গু নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ



নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত মশানাশকের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষিত ছয় ধরনের মশানাশকের মধ্যে পাঁচটির বিরুদ্ধেই এডিস মশা প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোনো কোনো রাসায়নিকের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় ১০ গুণ বাড়িয়েও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মশাকে মারা সম্ভব হয়নি। একটি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত এডিস মশা বেঁচে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে জাপানের ইনস্টিটিউট অব হেলথ সিকিউরিটির গবেষকদের সহযোগিতায় এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণায় এডিস মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি জিনগত পরিবর্তনেরও সন্ধান পাওয়া গেছে।

তিন শ্রেণির ছয় মশানাশক পরীক্ষা

২০২৩ সালে শুরু হওয়া গবেষণায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে এডিস মশার লার্ভা ও পূর্ণাঙ্গ মশার প্রায় ১ হাজার ৪৫০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। সরাসরি নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ফাঁদও ব্যবহার করা হয়।

গবেষকেরা তিন শ্রেণির ছয়টি মশানাশক পরীক্ষা করেন। এগুলোর মধ্যে পাইরেথ্রয়েড শ্রেণির চারটি—ডেল্টামেথ্রিন, আলফা-সাইপারমেথ্রিন, পারমেথ্রিন ও ইটোফেনপ্রক্স। কার্বামেট শ্রেণির বেন্ডিওকার্ব এবং অর্গানোফসফেট শ্রেণির ম্যালাথিয়নও পরীক্ষার আওতায় ছিল।

ফলাফলে দেখা যায়, পাইরেথ্রয়েডের চারটি এবং বেন্ডিওকার্বের বিরুদ্ধে এডিস মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ এসব রাসায়নিক প্রয়োগের পরও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মশা জীবিত থাকে।

পারমেথ্রিনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ফল

গবেষণায় পারমেথ্রিনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ফল পাওয়া গেছে। শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ ঘনত্বের এই রাসায়নিক প্রয়োগের ২৪ ঘণ্টা পর ঢাকায় প্রায় ৯০ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে প্রায় ৯৩ শতাংশ মশা জীবিত ছিল।

রাসায়নিকটির ঘনত্ব ১০ গুণ বাড়িয়ে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হলেও ঢাকায় ৭৯ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৮৪ শতাংশ মশা বেঁচে যায়।

ইটোফেনপ্রক্সের ক্ষেত্রেও প্রতিরোধের মাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক পরীক্ষামাত্রায় প্রয়োগের পর ঢাকায় প্রায় ৯৩ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৯০ শতাংশ মশা ২৪ ঘণ্টা পরও জীবিত ছিল।

ডেল্টামেথ্রিন ও আলফা-সাইপারমেথ্রিনের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মশা বেঁচে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

ম্যালাথিয়ন এখনো কার্যকর

ছয়টি মশানাশকের মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে পাওয়া গেছে ম্যালাথিয়ন। অর্গানোফসফেট শ্রেণির এই রাসায়নিক ব্যবহারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম—দুই শহর থেকেই সংগ্রহ করা প্রায় ৯৮ শতাংশ মশা মারা গেছে।

গবেষকেরা অবশ্য একটি রাসায়নিক কার্যকর পাওয়া যাওয়ায় সেটির ওপর দীর্ঘমেয়াদে পুরোপুরি নির্ভর করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। একই রাসায়নিক দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত বা নির্বিচারে ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে এডিস মশা সেটির বিরুদ্ধেও প্রতিরোধী হয়ে উঠতে পারে।

জিনগত পরিবর্তনের সন্ধান

গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এডিস মশার শরীরে কীটনাশক প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ, রাসায়নিকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধক্ষমতা শুধু পরিবেশগত অভিযোজনের বিষয় নয়; এর পেছনে জিনগত কারণও ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষকেরা মাঠ থেকে সংগ্রহ করা মশার পাশাপাশি গবেষণাগারে জন্মানো পরবর্তী প্রজন্মের মশার ওপরও পরীক্ষা চালিয়েছেন। পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে কিছু রাসায়নিকের বিরুদ্ধে মৃত্যুহার তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেলেও মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধের বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শুধু রাসায়নিক দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কঠিন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু কীটনাশকের ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা আরও জটিল হতে পারে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং বিকল্প বা জৈব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা মশা, ডেঙ্গু রোগী এবং ব্যবহৃত কীটনাশকের কার্যকারিতা—এই তিনটি বিষয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কোন এলাকায় কোন রাসায়নিক কার্যকর এবং কোথায় প্রতিরোধ তৈরি হয়েছে, সে তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা গেলে মশা নিয়ন্ত্রণের কৌশল আরও কার্যকরভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।

ডেঙ্গু মৌসুমে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন

এডিস মশার কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ার তথ্য এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রচলিত মশানাশক অকার্যকর হয়ে পড়লে নগর এলাকায় মশার ঘনত্ব কমানো আরও কঠিন হতে পারে।

তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক ব্যবহারের পাশাপাশি বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্রসহ সম্ভাব্য সব প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং জমে থাকা পানি অপসারণ করা জরুরি।

গবেষণার ফলাফল মূলত ঢাকা ও চট্টগ্রামে সংগৃহীত নমুনার ওপর ভিত্তি করে পাওয়া গেছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে এডিস মশার কীটনাশক প্রতিরোধের পরিস্থিতি জানতে আরও বিস্তৃত গবেষণা ও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।

Post a Comment

0 Comments