Header Ads Widget

Responsive Advertisement

জ্বালানি সংকট কাটাতে সরকারের উদ্যোগ, তবে বাস্তবায়নে ধীরগতি



নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা

দেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রথম ছয় মাসের মেয়াদের অর্ধেক সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে চাপ, গ্যাসের ঘাটতি এবং বিদ্যুতের লোডশেডিং—তিন দিক থেকেই সংকট তৈরি হয়েছে। সরকার বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এখনো প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বর্তমান সংকট এক দিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ খাতে বড় আর্থিক দায় এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা সংকটকে জটিল করেছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক এলএনজি টার্মিনাল সমস্যাও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।

জ্বালানি তেলে সরবরাহ সংকট

চলতি বছরের মার্চে জ্বালানি তেল নিয়ে দেশে উদ্বেগ তৈরি হলে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক দিনের মধ্যে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেশনিং চালুর পর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পরে রেশনিং প্রত্যাহার, সরবরাহ বৃদ্ধি ও মূল্য সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

তবে ওই অভিজ্ঞতার পরও দেশে জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ তেমন এগোয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আমদানি ব্যাহত হলে ভবিষ্যতে আবারও সরবরাহ সংকট তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

গ্যাস সংকট আরও প্রকট

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক দশক আগে দৈনিক প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হলেও বর্তমানে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১৬৩ কোটি ঘনফুটে। বিপরীতে দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।

গ্যাসের ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু টার্মিনাল, কার্গো ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি আমদানি সবসময় সম্ভব হচ্ছে না।

সম্প্রতি একটি এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সরবরাহের ওপর আরও চাপ তৈরি হয়। পরে টার্মিনালটি আংশিকভাবে সরবরাহ শুরু করলেও এলএনজি কার্গোর অনিশ্চয়তায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি।

১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে সরকার স্থলভাগে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এর আগে নেওয়া ৫০টি কূপের পরিকল্পনার পাশাপাশি আরও কূপ খননের উদ্যোগ রয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত পরিকল্পনার তুলনায় বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। অনুসন্ধান ও নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে সময় লাগায় দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগও কম।

একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরও নতুন গ্যাস আবিষ্কার ও উৎপাদনে যেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।

নতুন এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ

গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে নতুন ভাসমান ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি নতুন ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি মাতারবাড়ীতে স্থলভিত্তিক টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তুতিও চলছে।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এলএনজি আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে অবকাঠামো সক্ষমতা না বাড়ালে শুধু আমদানি বাড়িয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি তেল শোধনাগারের পরিকল্পনা

দেশে বর্তমানে সরকারি মালিকানাধীন প্রধান জ্বালানি তেল শোধনাগারটি বহু পুরোনো। নতুন করে ৩০ লাখ টন সক্ষমতার একটি শোধনাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রকল্পের বাস্তবায়ন এখনো গতি পায়নি।

সরকারি পরিকল্পনায় ভবিষ্যতে বড় সক্ষমতার নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের কথাও রয়েছে। এর লক্ষ্য হলো পরিশোধিত জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা।

বিদ্যুৎ খাতেও বাড়ছে চাপ

গ্যাসের ঘাটতি সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানি সংকট ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে উৎপাদন অনেক কমে যাচ্ছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিলও খাতটির বড় সমস্যা। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়া প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব

জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপরও জোর দিচ্ছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন উপকরণ আমদানিতে কয়েক ধরনের শুল্ক ও কর সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, নীতিগত কিছু শর্তের কারণে এই খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।

বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল বিক্রির প্রস্তাব

জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি কোম্পানিকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। বর্তমানে সরকারি তিনটি কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা—ডিলারদের মাধ্যমে বাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে।

প্রস্তাবিত নীতিমালা কার্যকর হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত ডিজেল, পেট্রল ও অকটেন আমদানি করে নিজস্ব ডিলার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিক্রি করতে পারবে।

তবে এ উদ্যোগ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একাংশের আশঙ্কা, যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বাজারে মূল্য অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতা বাড়ানো ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার যুক্তি সামনে আসছে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানই বড় চ্যালেঞ্জ

সরকারের পরিকল্পনায় সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান, নতুন এলএনজি টার্মিনাল, বড় তেল শোধনাগার, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং জ্বালানি অবকাঠামো সম্প্রসারণের মতো বেশ কিছু উদ্যোগ রয়েছে।

তবে এসব প্রকল্পের সুফল পেতে সময় লাগবে। তাই স্বল্পমেয়াদে আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধান—দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, শুধু সংকটের সময় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতের সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক অনুসন্ধান, পর্যাপ্ত মজুত, আধুনিক অবকাঠামো এবং স্বচ্ছ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।

Post a Comment

0 Comments