Header Ads Widget

Responsive Advertisement

বন্দুকের গুলিতে জন্ম, ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধখরচ—আড়াই শতকে যুক্তরাষ্ট্র কী পেল, কী হারাল?


আন্তর্জাতিক ডেস্ক: স্বাধীনতার জন্য শুরু হওয়া যুদ্ধ থেকে বিশ্বশক্তি হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথ—যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় আড়াই শতকের ইতিহাস সামরিক সংঘাতের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, দুই বিশ্বযুদ্ধ, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক, আফগানিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত—প্রতিটি যুদ্ধই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাবকে কোনো না কোনোভাবে বদলে দিয়েছে।

তবে এই সামরিক শক্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে হয়েছে বিশাল মূল্য। লাখো মানুষের প্রাণহানি, বিপুলসংখ্যক আহত ও বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং ট্রিলিয়ন ডলারের যুদ্ধব্যয়—সব মিলিয়ে মার্কিন যুদ্ধ-ইতিহাসের রয়েছে এক বিশাল মানবিক ও অর্থনৈতিক হিসাব।

যে গুলির শব্দে শুরু যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধযাত্রা

১৭৭৫ সালের ১৯ এপ্রিল ম্যাসাচুসেটসের লেক্সিংটন ও কনকর্ডে ব্রিটিশ সেনা এবং উপনিবেশগুলোর মিলিশিয়ার সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতাযুদ্ধ।

যুদ্ধের প্রথম গুলিটি ঠিক কে ছুড়েছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ইতিহাসে এই ঘটনাই পরে ‘দ্য শট হার্ড রাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামে পরিচিত হয়।

আট বছর ধরে চলা যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে ১৭৮৩ সালের প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু যুদ্ধের মানবিক মূল্য ছিল নতুন রাষ্ট্রটির জন্য অত্যন্ত বড়। গবেষণা অনুযায়ী, মার্কিন যোদ্ধাদের মৃত্যুর বড় একটি অংশ যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং রোগ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও বন্দিত্বের কারণে হয়েছিল।

গৃহযুদ্ধ: যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত

স্বাধীনতার প্রায় এক শতাব্দী পর ১৮৬১ সালে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধ। দাসপ্রথা, অঙ্গরাজ্যগুলোর ক্ষমতা ও দেশের ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে গভীর বিরোধ থেকে এই সংঘাতের জন্ম।

চার বছরব্যাপী যুদ্ধে প্রাণহানির হিসাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। পুরোনো হিসাবে প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হলেও পরবর্তী জনমিতিক গবেষণায় মৃতের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৫২ হাজার বা তারও বেশি হতে পারে বলে উঠে এসেছে।

গৃহযুদ্ধ শুধু প্রাণহানির দিক থেকেই নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকেও ছিল বিপুল। ইউনিয়ন ও কনফেডারেসি—দুই পক্ষ মিলিয়ে যুদ্ধ পরিচালনায় সে সময় প্রায় ৬ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছিল।

এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ছিল গভীর। দাসপ্রথার অবসানের পথ তৈরি হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: তুলনামূলক কম ক্ষতি, কিন্তু বিশ্বরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেয় ১৯১৭ সালে। এর আগে ইউরোপে কয়েক বছর ধরে চলছিল ভয়াবহ ট্রেঞ্চ যুদ্ধ।

যুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রায় ৪৭ লাখ মার্কিন সেনার মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি নিহত হন। তাঁদের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহতের পাশাপাশি রোগে মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে ১৯১৮ সালের ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারি মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর ওপর বড় প্রভাব ফেলেছিল।

এই যুদ্ধের শেষে জার্মানি, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ফলে ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্রও ব্যাপকভাবে বদলে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: যুদ্ধশক্তি থেকে অর্থনৈতিক পরাশক্তি

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে জাপানের আকস্মিক হামলার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি প্রবেশ করে যুক্তরাষ্ট্র।

এরপর শুরু হয় দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ সামরিক ও শিল্প সমাবেশ। যুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসংখ্যা এক কোটিরও বেশি হয়ে যায়। বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ যুদ্ধশিল্পে যুক্ত হন; শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।

যুদ্ধ শেষে ৪ লাখের বেশি মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন এবং আরও প্রায় ৭ লাখ আহত হন।

অর্থনৈতিক মূল্যও ছিল বিশাল। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি বলে বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা যায়।

তবে যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি নয়, বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হয়।

কোরীয় যুদ্ধ: যুদ্ধ শেষ হয়নি, শুধু থেমেছে

১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়ার দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রমণের পর কোরীয় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র।

তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রাণ হারান। বিভিন্ন গবেষণায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন সেনাদের মৃত্যুর হিসাবও বিভিন্ন সূত্রে ৩৬ হাজার থেকে ৪০ হাজারের মধ্যে পাওয়া যায়।

১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই যুদ্ধবিরতি হলেও আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি। ফলে সাত দশকেরও বেশি সময় পরও কোরীয় উপদ্বীপের বিভাজন বহাল রয়েছে।

যুদ্ধ কি শুধু বিজয় এনে দিয়েছে?

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সব যুদ্ধ একইভাবে শেষ হয়নি। কিছু সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বা কৌশলগত সাফল্য পেয়েছে, আবার কিছু যুদ্ধ শেষ হয়েছে অচলাবস্থা, সেনা প্রত্যাহার কিংবা দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে।

প্রতিটি যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিশাল মানবিক মূল্য। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা, অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম, সেনা মোতায়েন ও পুনর্গঠনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে।

অন্যদিকে এসব যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রভাবকেও শক্তিশালী করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

সামনে আরও বড় হিসাব: ভিয়েতনাম থেকে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ-ইতিহাস এখানেই শেষ নয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাক যুদ্ধ, আফগানিস্তানে দীর্ঘ সামরিক অভিযান এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত—পরবর্তী কয়েক দশকেও ওয়াশিংটন বারবার সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়েছে।

এসব সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র কত অর্থ ব্যয় করেছে এবং এর বিনিময়ে কী ধরনের কৌশলগত অর্জন হয়েছে—তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।

বিশেষ করে আফগানিস্তানে দুই দশকের সামরিক উপস্থিতি ও মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ সংঘাতের পর প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে:

সামরিক শক্তি দিয়ে বিশ্বে প্রভাব বাড়াতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত অর্জন কতটা, আর মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা?

আড়াই শতকের শিক্ষা কী?

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস দেখায়, যুদ্ধ কখনো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সমাজ, জনসংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর।

কিছু যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে আরও শক্তিশালী করেছে, কিছু যুদ্ধ গভীর ক্ষত রেখে গেছে। কোথাও সামরিক বিজয় এসেছে, আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের জন্ম হয়েছে।

আড়াই শতকের এই ইতিহাস তাই শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির গল্প নয়; এটি ক্ষমতা, যুদ্ধ, অর্থনীতি এবং মানবিক মূল্যের একটি দীর্ঘ হিসাবও।

এক নজরে

  • 🇺🇸 স্বাধীনতাযুদ্ধ: ১৭৭৫–১৭৮৩

  • গৃহযুদ্ধ: ১৮৬১–১৮৬৫

  • প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ: ১৯১৭

  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ: ১৯৪১

  • কোরীয় যুদ্ধ: ১৯৫০–১৯৫৩

  • মার্কিন যুদ্ধের বড় মূল্য: প্রাণহানি, আহত ও বাস্তুচ্যুতি এবং বিপুল অর্থব্যয়

  • দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মূল্য: মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে

আড়াই শতকের যুদ্ধের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত একটি বড় প্রশ্নই সামনে আনে—বিশ্বশক্তি হওয়ার পথে যুক্তরাষ্ট্র যতটা অর্জন করেছে, তার প্রকৃত মূল্য কত?

Post a Comment

0 Comments