ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী মোটরসাইকেল দ্রুত শনাক্ত করতে এর সামনের অংশেও নম্বর প্লেট বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বর্তমানে অধিকাংশ মোটরসাইকেলে শুধু পেছনে নম্বর প্লেট থাকায় সড়কে স্থাপিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরায় সামনে থেকে মোটরসাইকেলের নিবন্ধন নম্বর শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ বিষয়ে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কারিগরি ও বাস্তব দিক পর্যালোচনার জন্য বিআরটিএ ইতিমধ্যে সাত সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করেছে।
কেন সামনে নম্বর প্লেট?
ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে বর্তমানে এআইভিত্তিক ক্যামেরার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্তের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। কোনো যানবাহন আইন ভাঙলে ক্যামেরার মাধ্যমে সেটি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট মালিকের বিরুদ্ধে ডিজিটালভাবে মামলা করার প্রক্রিয়াও রয়েছে।
কিন্তু মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে সামনের দিকে নিবন্ধন নম্বর দৃশ্যমান না থাকায় ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্তকরণে সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এই সমস্যা কমাতেই সামনে নম্বর প্লেট যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
গঠন করা হয়েছে সাত সদস্যের কমিটি
মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট স্থাপনের বাস্তবতা যাচাই করতে ১৩ আগস্ট সাত সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিআরটিএ। কমিটিকে নম্বর প্লেটের উপযুক্ত আকার ও আকৃতি, কোথায় এটি স্থাপন করা হবে এবং এআই ক্যামেরায় নম্বরটি কার্যকরভাবে পড়া যাবে কি না—এসব বিষয় পরীক্ষা করে মতামত দিতে বলা হয়েছে।
কমিটিতে বিআরটিএ, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং মোটরসাইকেল উৎপাদন ও আমদানি খাতের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
মোটরসাইকেলের নকশা নিয়ে উদ্বেগ
সামনে নম্বর প্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কিছু কারিগরি প্রশ্নও উঠেছে। দেশের অনেক প্রচলিত মোটরসাইকেলের সামনের অংশে নম্বর প্লেট স্থাপনের জন্য আলাদা জায়গা নেই। ফলে বিদ্যমান মোটরসাইকেলে নতুন করে প্লেট বসাতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হতে পারে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, ভুল জায়গায় প্লেট স্থাপন করলে মোটরসাইকেলের বায়ুপ্রবাহে বাধা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ গতিতে চলার সময় সামনের অংশে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হলে নিয়ন্ত্রণে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার হেডলাইট বা রেডিয়েটরের সামনে প্লেট বসানো হলে ইঞ্জিনে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে অতিরিক্ত তাপ তৈরির ঝুঁকিও থাকতে পারে।
তবে এসব বিষয় এখনো কারিগরি কমিটির পরীক্ষার আওতায় রয়েছে। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দেশে প্রায় ৫০ লাখ নিবন্ধিত মোটরসাইকেল
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। প্রতি বছর আরও প্রায় পাঁচ লাখ নতুন মোটরসাইকেল বাজারে যুক্ত হচ্ছে।
তাই সামনে নম্বর প্লেট বসানোর সিদ্ধান্ত শুধু নতুন মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে, নাকি বর্তমানে রাস্তায় চলাচল করা সব মোটরসাইকেলেও তা যুক্ত করতে হবে—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া অনেক মোটরসাইকেলের নম্বর প্লেট ক্ষতিগ্রস্ত, অস্পষ্ট বা বিভিন্নভাবে আড়াল করে রাখা হয়। এসব ক্ষেত্রে শুধু সামনে নম্বর প্লেট যুক্ত করলেই ট্রাফিক আইন প্রয়োগের সব সমস্যা দূর হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এআই ক্যামেরায় স্বয়ংক্রিয় মামলা
ঢাকার বিভিন্ন সড়কে ৭ মে থেকে পরীক্ষামূলকভাবে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্তের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ক্যামেরার সঙ্গে বিশেষ সফটওয়্যার যুক্ত থাকায় নির্দিষ্ট ধরনের আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করার পর সংশ্লিষ্ট যানবাহনের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা করার ব্যবস্থা রয়েছে।
এ কাজে পিটিজেড ধরনের উন্নত ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ক্যামেরা ঘুরে চারপাশের ছবি ও ভিডিও ধারণের পাশাপাশি চলমান যানবাহনকে অনুসরণ করতে পারে।
বিকল্প হিসেবে আরএফআইডির প্রস্তাব
সড়ক ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন, শুধু ক্যামেরার ওপর নির্ভর না করে যানবাহন শনাক্তে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন বা আরএফআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
এই প্রযুক্তিতে প্রতিটি গাড়ির সঙ্গে একটি স্বতন্ত্র ইলেকট্রনিক ট্যাগ যুক্ত থাকে। সড়কের নির্দিষ্ট স্থানে থাকা রিডার রেডিও সংকেতের মাধ্যমে ওই ট্যাগ শনাক্ত করতে পারে। ফলে গাড়ির নিবন্ধন নম্বর, চলাচলের সময় এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য দ্রুত ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামনে নম্বর প্লেট থাকলেও যানজটের সময় এক মোটরসাইকেলের সামনে আরেক যানবাহন থাকলে ক্যামেরার মাধ্যমে নম্বর শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিনির্ভর যানবাহন শনাক্তকরণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সরকারের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ট্রাফিক আইন প্রয়োগে এআই ক্যামেরার কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি মোটরসাইকেলের নিরাপত্তা, নকশা ও ব্যবহারিক সুবিধা বজায় রেখে কীভাবে সামনে নম্বর প্লেট যুক্ত করা যায়। এ বিষয়ে বিআরটিএর কারিগরি কমিটির সুপারিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

0 Comments