Header Ads Widget

Responsive Advertisement

এলডিসি উত্তরণে ৩ বছর বাড়তি সময়, অর্থনীতি বাঁচাতে ব্যাপক বিনিয়োগই এখন বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ


জাতীয় ডেস্ক

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের পরিবর্তে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি-সংশ্লিষ্ট সুবিধা ও প্রস্তুতির সময় পাচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হলেও অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতিতে নতুন করে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, রপ্তানি বহুমুখীকরণের সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী তিন বছরকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এখন সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উত্তরণের সময় বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সংকট কাটানো সম্ভব নয়। বরং এ সময়ের মধ্যে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ২০২৯ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিশেষ সুবিধা হারানোর চাপ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও জটিল পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে।

জাতিসংঘে সর্বসম্মত অনুমোদন, ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ

গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক প্লেনারি সভায় বাংলাদেশ ও নেপালের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ‘গ্রুপ অব ৭৭’ ও চীনের পক্ষে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের উত্তরণ পেছানোর বিষয়ে খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করেন উরুগুয়ের প্রতিনিধি। পরে কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি পাস হয়।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন। প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে কোনো দেশের প্রতিনিধি বক্তব্য দেননি। বরং ফ্রান্স, কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের উত্তরণ প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর বিষয়ে সমর্থন জানান। তবে তাঁরা অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০১৮ সালে দেশটির এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ২০২৪ সালে চূড়ান্ত উত্তরণের প্রস্তুতিকাল শেষ হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারির কারণে অতিরিক্ত দুই বছর সময় পাওয়া যায়। সে অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসুবিধা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নতুন সরকার আরও তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘের কাছে আবেদন করে। শেষ পর্যন্ত সেই আবেদন অনুমোদিত হওয়ায় ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্তুতির সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সময় বাড়ল, কিন্তু বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংস্কারে অগ্রগতি কতটা?

এলডিসি উত্তরণের সময় বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক হলেও অর্থনীতির মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান না হলে এই অর্জন প্রত্যাশিত সুফল দেবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিসংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিন ধরে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ছোট-বড় ব্যবসার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।

ব্যবসা-বাণিজ্যের মন্দার প্রভাব শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। বড় মার্কেটের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারের ছোট দোকান, পাইকারি ব্যবসা, পরিবহন এবং সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমালে তার প্রভাব পড়ে কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন শ্রমিক, পাইকারি বিক্রেতা ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপরও।

ফলে বিনিয়োগ স্থবিরতা একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ভোগব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন সরকার বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে বিনিয়োগের আশ্বাস পেলেও সেগুলো বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তর করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। শুধু চুক্তি বা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেই বিনিয়োগ আসে না। প্রয়োজন জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, দ্রুত অনুমোদন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার নিশ্চয়তা।

জাপানের এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি: নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি করেছে জাপানের সাম্প্রতিক প্রতিশ্রুতি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের পর আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি।

এর আর্থিক মূল্য আনুমানিক ৬৩০ থেকে ৬৩৫ কোটি মার্কিন ডলার। এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

জাপানের বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদনশিল্প, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিকস, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস এবং দক্ষতাভিত্তিক শিল্পে জাপানি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

তবে প্রতিশ্রুত বিনিয়োগ এবং বাস্তবে দেশে আসা বিনিয়োগ এক বিষয় নয়। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জাপানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে ঋণচুক্তি, উন্নয়ন সহযোগিতা ও সমঝোতা হলেও সব উদ্যোগ একই গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি। কোথাও প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, কোথাও প্রশাসনিক জটিলতা, আবার কোথাও আর্থিক ও নীতিগত সমস্যার কারণে অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

তাই নতুন বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপান্তর করতে প্রকল্পভিত্তিক সময়সীমা, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

চীন: বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বিনিয়োগের বড় সুযোগ

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে আমদানি ও রপ্তানির মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর গত পাঁচ অর্থবছরের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি গড়ে প্রায় ৭০ কোটি ডলার হলেও একই সময়ে দেশটি থেকে বাংলাদেশ ১৭ থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।

এই ব্যবধান বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। কারণ চীন থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল, শিল্পযন্ত্র, ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রাংশ এবং ভোগ্যপণ্য আমদানি হলেও সেই অনুপাতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হয়নি।

তবে এই বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর একটি বড় সুযোগও রয়েছে। চীনের বিশাল ভোক্তা বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে রপ্তানি আয় বাড়ানো সম্ভব।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের টেক্সটাইল পণ্য বর্তমানে চীনের বাজারে শূন্য শুল্ক সুবিধা পাচ্ছে, যা ২০২৮ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকার কথা। কিন্তু এই সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেনি বাংলাদেশ।

অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. মাহফুজ কবীরের মতে, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চীনের শূন্য শুল্ক সুবিধাকে কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য চীনা ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতা উন্নত করতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের কোনো পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যদি চীনের বড় ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তি করতে পারে, তাহলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। একইভাবে চামড়া ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা গেলে নতুন বাজার সৃষ্টি হতে পারে।

চীনের আমদানি বাড়ছে, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য সম্ভাবনা

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত চীনের বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশটির মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।

এ সময়ে চীনের রপ্তানি বেড়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানির তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধি দ্রুত হয়েছে।

এ প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিতে পারে। কারণ চীনের আমদানি চাহিদা বাড়লে বিদেশি পণ্যের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশের পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, সরবরাহের ধারাবাহিকতা এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে চীনা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে শুধু উৎপাদন নয়, প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং রপ্তানিমুখী শিল্প সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

অবকাঠামো ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগের বড় বাধা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা মনে করেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপান্তর করতে অবকাঠামোগত সমস্যা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা প্রয়োজন।

একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করতে চাইলে জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, নির্মাণ অনুমোদন এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের অনুমতির প্রয়োজন হয়। এসব প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা থাকলে বিনিয়োগকারী বিকল্প দেশ বেছে নিতে পারেন।

অন্যদিকে একই ধরনের শিল্প স্থাপনের জন্য যদি কোনো প্রতিযোগী দেশ দ্রুত জমি, বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং প্রশাসনিক অনুমোদন দিতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সেই দেশ এগিয়ে যাবে।

তাই বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করা, অনুমোদন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারি সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

ড. বিদিশা একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বাস্তব সুফল প্রয়োজন

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপার এবং ভারতের মতো অংশীদারদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব দেশের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে বিনিয়োগ, ঋণ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের বিষয়ে চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে।

তবে সব উদ্যোগ প্রত্যাশিত গতিতে বাস্তবায়িত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, ব্যবসায়িক স্বচ্ছতা এবং নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্রেও প্রতিশ্রুত উদ্যোগের বাস্তবায়ন অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ধীরগতি দূর করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও শিল্প বিনিয়োগের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বহুমুখী বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্পর্ক গড়ে তোলা বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর হতে পারে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ কমিয়েছে: বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগ কমেছে। নতুন সরকারের সামনে বিনিয়োগকে আবার জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ।

তাঁর মতে, চীন ও চীনা বিনিয়োগের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জোরালো সমর্থন রয়েছে। তবে চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিদেশে বিনিয়োগের সক্ষমতাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের আমদানি বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও কৃষিপণ্যের জন্য বড় ভোক্তা বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নয়, বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি আস্থা অর্জন করতে হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তির নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগের মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার নিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও রেমিট্যান্স: নতুন অর্থনৈতিক ঝুঁকি

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা হলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি।

আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংসের সতর্কতার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের ওপর চাপ বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, পরিবারগুলোর জীবনযাত্রা এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

উদাহরণ হিসেবে, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান সংকুচিত হলে বা সংঘাতের কারণে শ্রমবাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে প্রবাসী কর্মীদের আয় ও দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির মূল্য বাড়লে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণ, রেমিট্যান্স প্রবাহের স্থিতিশীলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা প্রয়োজন।

এলডিসি উত্তরণে কী কী সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে?

স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বেশ কিছু বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছে। এর মধ্যে ইউরোপের বাজারে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার অন্যতম।

এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধার অনেকগুলো পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত বা সংকুচিত হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, নতুন প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে।

এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত কিছু উন্নয়ন সহযোগিতা, নমনীয় শর্তে ঋণ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সুযোগও পরিবর্তিত হতে পারে।

ওষুধশিল্পের ক্ষেত্রেও মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ কিছু বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। উত্তরণের পর সেগুলোর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের আগাম প্রস্তুতি প্রয়োজন।

তাই অতিরিক্ত তিন বছরকে শুধু সময়ক্ষেপণের সুযোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এই সময়ের মধ্যে শিল্পের উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা: অর্থনৈতিক রূপান্তরের বড় সুযোগ

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্তটিকে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত আইরিন খান জানিয়েছেন, বর্ধিত সময়কে কাজে লাগাতে সরকার তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এতে প্রতি বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই পরিকল্পনার আওতায় কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

কার্যকরভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে তিনটি পর্যায়ে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যেতে পারে।

প্রথম বছর: বিনিয়োগ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা

  • বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন সহজ করা।

  • ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের আস্থা পুনর্গঠন।

  • শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা।

  • চলমান বিদেশি বিনিয়োগ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা।

দ্বিতীয় বছর: উৎপাদন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ

  • তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, কৃষিপণ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিপণ্য রপ্তানি বাড়ানো।

  • চীনা ও জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে নতুন শিল্প অংশীদারত্ব গড়ে তোলা।

  • আন্তর্জাতিক মান ও পণ্যের গুণগত সক্ষমতা বাড়ানো।

  • দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ।

তৃতীয় বছর: উত্তরণ-পরবর্তী অর্থনীতির প্রস্তুতি

  • আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি ও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা এগিয়ে নেওয়া।

  • রপ্তানিকারকদের জন্য বিকল্প বাজার নিশ্চিত করা।

  • এলডিসি-পরবর্তী শুল্ক ও মেধাস্বত্বসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি।

  • সামষ্টিক অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করা।

বিজিএমইএর মত: বাড়তি সময়কে শতভাগ কাজে লাগাতে হবে

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তাঁর মতে, এটি সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে চিঠি দিয়ে ব্যক্তিগত সহযোগিতা চেয়েছেন, যা এই উদ্যোগে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা তুলে ধরে।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, এখন এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আগামী তিন বছরের মধ্যে সফল ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য সরকার, বেসরকারি খাত এবং সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণকালীন এবং উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে প্রণীত জাতীয় কৌশলগত রূপরেখা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। তা না হলে রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নমনীয় সুদে ঋণসহায়তার মতো বিশেষ সুযোগ ক্রমে সংকুচিত হতে পারে।

তাঁর আশাবাদ, আগামী তিন বছরের প্রস্তুতিকালে বাংলাদেশ মসৃণ ও টেকসই উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পথ—অতিরিক্ত তিন বছরকে যথাযথ সংস্কার, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো, অথবা আগের মতো প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। ২০২৯ সালে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা শক্ত অবস্থানে থাকবে, তার বড় অংশই নির্ধারিত হবে আগামী তিন বছরের বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে।

Post a Comment

0 Comments