বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে চায় চীন। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী বাংলাদেশ। দুই দেশের প্রতিনিধিরা বলেছেন, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি উভয় দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঢাকায় চীনের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং ঢাকায় চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউইন। পরে ঢাকার চীনা দূতাবাসের এক বিজ্ঞপ্তিতে অনুষ্ঠানের তথ্য জানানো হয়।
চীনের উন্নয়ন থেকে বাংলাদেশের শেখার সুযোগ
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, গত ৭৭ বছরে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে চীনের অর্জন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয়। চীনের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বাংলাদেশ আগ্রহী।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সহযোগিতা গড়ে উঠলে তা দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে।
তবে সহযোগিতার সুফল নিশ্চিত করতে বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর, স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সংযোগ এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায় বেইজিং
অনুষ্ঠানে ঢাকায় চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউইন বলেন, দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের কৌশলগত দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন সম্প্রদায়’ গড়ে তোলার যৌথ উদ্যোগ দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে চীন পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা সম্প্রসারণেও বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বেইজিং।
চীনের এই বক্তব্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাণিজ্যের পাশাপাশি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রতিফলিত হয়েছে। তবে অনুষ্ঠানে নতুন কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্প, বিনিয়োগের অঙ্ক কিংবা বাণিজ্যিক চুক্তি ঘোষণা করা হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নে সম্ভাবনা
বাংলাদেশ ও চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে পণ্য আমদানি-রপ্তানি, শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং বিনিয়োগ। এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের উৎপাদন ও রপ্তানি খাত উপকৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:
রপ্তানি বহুমুখীকরণ: তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ।
উৎপাদন ও প্রযুক্তি: চীনা বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় কারখানায় আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো।
কর্মসংস্থান: নতুন শিল্প ও বিনিয়োগ প্রকল্পে স্থানীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
বিনিয়োগের কার্যকারিতা: প্রকল্পের ব্যয়, অর্থায়নের শর্ত, পরিবেশগত প্রভাব ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় বিবেচনায় রেখে বিনিয়োগ নির্বাচন।
বাণিজ্য ঘাটতি কমানো: শুধু আমদানি বাড়ানোর পরিবর্তে বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি ও বাজার প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি পর্যায়ের নীতিগত সহযোগিতার পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠন, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা নতুন নয়। ২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরেও বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও পানি ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয় উঠে আসে। ওই সফরের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকায় চীনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দুই পক্ষের বক্তব্যকে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা যায়। তবে ১৫ অক্টোবরের অনুষ্ঠানেই জুনের আলোচনার কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের নতুন অগ্রগতি বা চুক্তি ঘোষণা হয়েছে—এমন দাবি করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ ও চীন উভয় পক্ষই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এখন এই আগ্রহকে বাস্তব ফলাফলে রূপ দিতে বাণিজ্য বাধা দূর করা, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি, প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর এবং বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তবায়িত উদ্যোগ, বিনিয়োগের গুণগত মান এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি সুফলের ওপর।

0 Comments