Header Ads Widget

Responsive Advertisement

চকবাজারে ১২ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে, ধোঁয়ায় অসুস্থ ৪ ফায়ার সার্ভিস কর্মী


পুরান ঢাকার মনসুর খান প্লাজায় অগ্নিকাণ্ডে দমকলের দীর্ঘ অভিযান; সরু গলি, পানির সংকট ও ঘন ধোঁয়ায় ব্যাহত হয় উদ্ধারকাজ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও আগুনের কারণ নিয়ে তদন্ত প্রয়োজন

জাতীয় ডেস্ক

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারায় মনসুর খান প্লাজা মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে শুরু হওয়া আগুন দীর্ঘ ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের চেষ্টার পর মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ভোর ৫টা ২০ মিনিটে নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত চার ফায়ার সার্ভিস কর্মী ঘন ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে দীর্ঘ সময় লাগার পেছনে ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া, সরু গলির কারণে অগ্নিনির্বাপণ যান চলাচলে অসুবিধা এবং পানির সংকটের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভেতরে জমে থাকা তাপ ও ধোঁয়ার কারণে পুনরায় আগুন জ্বলে ওঠার আশঙ্কা ছিল। এ কারণে ঘটনাস্থলে পানি দেওয়ার কাজ অব্যাহত রাখা হয়।

সোমবার বিকেলে আগুন, রাতভর চলে অভিযান

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর সোমবার বিকেল ৫টার দিকে চকবাজারের ছোট কাটারায় মনসুর খান প্লাজা মার্কেটের একটি দোকান বা গোডাউনে আগুনের সূত্রপাত হয়। অল্প সময়ের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ফায়ার সার্ভিসকে দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়।

সন্ধ্যা ও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা জোরদার করা হয়। বিভিন্ন পর্যায়ে ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটের সংখ্যা বাড়ানো হয়। আগুনের তীব্রতা, ভবনের ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়া এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম নিয়ে ভেতরে প্রবেশের জটিলতা উদ্ধারকাজকে কঠিন করে তোলে।

ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসা এবং আগুনের সব উৎস সম্পূর্ণ নিভে যাওয়া এক বিষয় নয়। ভবনের ভেতরে কোথাও তাপ বা আগুনের অবশিষ্ট অংশ থাকলে তা থেকে আবার অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ধোঁয়ায় অসুস্থ চার ফায়ার সার্ভিস কর্মী

অগ্নিনির্বাপণ অভিযানের সময় ঘন ধোঁয়ার কারণে ফায়ার সার্ভিসের চার কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজনকে সোমবার রাত ১১টার দিকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। পরবর্তী প্রতিবেদনে অসুস্থ কর্মীর সংখ্যা চার বলে উল্লেখ করা হয়।

অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, অসুস্থ চার কর্মীকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। তাঁদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ তথ্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অগ্নিনির্বাপণকর্মীরা আগুনের সরাসরি তাপের পাশাপাশি ধোঁয়া, কার্বন মনোক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস এবং অক্সিজেনের স্বল্পতার ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষ করে বন্ধ বা কম বায়ু চলাচলকারী ভবনে দীর্ঘ সময় কাজ করলে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ও অচেতন হয়ে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই আগুন নেভানোর পাশাপাশি কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাসের সুরক্ষা সরঞ্জাম, চিকিৎসা সহায়তা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

সরু গলি ও পানির সংকটে বাড়ে চ্যালেঞ্জ

পুরান ঢাকার অনেক এলাকায় ভবন ও দোকানঘর ঘনভাবে গড়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও রাস্তা ও গলি এত সরু যে বড় অগ্নিনির্বাপণ যান সহজে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে না। চকবাজারের এই অগ্নিকাণ্ডেও সরু গলি ও পানির সংকটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কাজ ব্যাহত হওয়ার কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত পর্যাপ্ত পানি পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির উৎস দূরে হলে, সরবরাহের চাপ কম থাকলে কিংবা বিকল্প উৎস ব্যবহার করতে হলে আগুন নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে। একইভাবে, অগ্নিনির্বাপণ যান ঘটনাস্থলের কাছে পৌঁছাতে না পারলে পানির লাইন টেনে নেওয়া ও সরঞ্জাম স্থাপনেও সময় ব্যয় হয়।

ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আগুন লাগলে আশপাশের দোকান, গোডাউন ও ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই অগ্নিকাণ্ডের পর পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতে জরুরি যান চলাচলের পথ, পানির উৎস এবং ভবনগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর—সেসব বিষয় পর্যালোচনা করা জরুরি।

আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও কেন পানি দেওয়া চলছিল?

মঙ্গলবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ধোঁয়া ও তাপের কারণে আবার আগুন জ্বলে ওঠার আশঙ্কা ছিল। এ কারণে ঘটনাস্থলে পানি দেওয়ার কাজ অব্যাহত রাখা হয়।

বাণিজ্যিক ভবন বা গোডাউনে কাগজ, প্লাস্টিক, কাপড়, প্যাকেজিং উপকরণ কিংবা অন্যান্য দাহ্য সামগ্রী থাকলে সেগুলোর ভেতরে তাপ দীর্ঘ সময় ধরে থাকতে পারে। বাইরে থেকে আগুন নিভে গেছে বলে মনে হলেও ভেতরের কোনো অংশে আগুনের অবশিষ্ট উৎস থেকে পুনরায় অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস সাধারণত হটস্পট শনাক্ত, ধোঁয়া অপসারণ, অবশিষ্ট তাপ পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পানি প্রয়োগ করে। আগুন পুরোপুরি নির্বাপিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষয়ক্ষতি ও অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো স্পষ্ট নয়

অগ্নিকাণ্ডে ভবনের কতটুকু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কতগুলো দোকান বা গোডাউনের মালামাল পুড়েছে এবং মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট নয়। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ, দাহ্য পদার্থের অনিরাপদ সংরক্ষণ বা অন্য কোনো কারণে আগুন লাগতে পারে। কিন্তু তদন্ত ছাড়া কোনো একটি কারণকে দায়ী করা ঠিক হবে না।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণে ঘটনাস্থলের আলামত, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, দোকান বা গোডাউনে রাখা সামগ্রী এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের তালিকা ও সম্পদের হিসাব সংগ্রহ করা হলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব হবে।

পুরান ঢাকার চকবাজারে মনসুর খান প্লাজা মার্কেটের আগুন দীর্ঘ ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ফায়ার সার্ভিসের প্রচেষ্টার পর নিয়ন্ত্রণে আসে। অগ্নিনির্বাপণ অভিযানে ধোঁয়ায় চার কর্মীর অসুস্থ হয়ে পড়া, সরু গলি ও পানির সংকটের মতো বিষয়গুলো ঘনবসতিপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় জরুরি সেবার চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে।

এখন আগুনের প্রকৃত কারণ, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার অবস্থা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা মোকাবিলায় জরুরি যান চলাচলের পথ উন্মুক্ত রাখা, পর্যাপ্ত পানির উৎস নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত অগ্নিনিরাপত্তা পরীক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন।

Post a Comment

0 Comments