শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে উদ্যাপন নিশ্চিত করতে সারা দেশে ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ জন আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পূজামণ্ডপে আটজন করে এবং সাধারণ পূজামণ্ডপে ছয়জন করে আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে ১০৪টি স্ট্রাইকিং পেট্রোল দল।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর খিলগাঁওয়ে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদর দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
তিনি জানান, এ বছর সারা দেশে ৩৩ হাজার ১৬৫টি পূজামণ্ডপের তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ৯১৪টি মণ্ডপকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব মণ্ডপের নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে এবারও ব্যবহার করা হবে ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’। এর মাধ্যমে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে বলে জানিয়েছেন আনসার মহাপরিচালক।
ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপে বাড়তি নিরাপত্তা
দুর্গাপূজায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সব মণ্ডপের ঝুঁকি এক রকম নয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত মণ্ডপগুলোতে তুলনামূলক বেশি সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
আনসার মহাপরিচালকের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপে আটজন এবং সাধারণ মণ্ডপে ছয়জন করে সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর পাশাপাশি স্ট্রাইকিং পেট্রোল দল প্রস্তুত থাকবে, যাতে কোনো স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
নিরাপত্তা পরিকল্পনার উদ্দেশ্য শুধু মণ্ডপ পাহারা দেওয়া নয়; বরং পূজার আয়োজন, দর্শনার্থীদের চলাচল এবং সার্বিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতেও সহায়তা করা। কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে যাতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহার, থাকবে ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। এ লক্ষ্যে গত বছরের মতো এবারও ব্যবহার করা হবে ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’।
মহাপরিচালক জানান, অ্যাপটিতে ৬৬ হাজার সদস্য নিবন্ধিত থাকবেন। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও জানান, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রযুক্তিনির্ভর এ ধরনের ব্যবস্থার ব্যবহার করা হয়েছিল। এবার দুর্গাপূজার নিরাপত্তা কার্যক্রমেও অ্যাপটি সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রযুক্তির কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে সঠিক তথ্য সরবরাহ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগের ওপর।
১০৪টি স্ট্রাইকিং পেট্রোল, নজরদারিতে থাকবে দায়িত্ব পালন
পূজামণ্ডপে মোতায়েন করা সদস্যদের পাশাপাশি ১০৪টি স্ট্রাইকিং পেট্রোল দল দায়িত্ব পালন করবে। কোনো মণ্ডপে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দ্রুত সেখানে পৌঁছানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণে এসব দল ভূমিকা রাখবে।
আনসার মহাপরিচালক জানান, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সদস্যদের কার্যক্রম তদারকির জন্য বাহিনীর নিজস্ব মনিটরিং ব্যবস্থা রয়েছে। কোথাও কোনো অনিয়ম বা অপ্রীতিকর ঘটনার তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো সদস্য পক্ষপাতমূলক আচরণ করলে অভিযোগ যাচাই করে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের পেশাদারত্ব, নিরপেক্ষতা এবং জনসাধারণের সঙ্গে দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জনসমাগমপূর্ণ স্থানে উত্তেজনা তৈরি হলে পরিস্থিতি শান্ত রাখা এবং দ্রুত তথ্য যাচাই করা জরুরি।
সীমান্তবর্তী মণ্ডপেও নিরাপত্তা জোরদার
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় আনসার-ভিডিপির পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও দায়িত্ব পালন করবে।
প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, সীমান্তবর্তী ২ হাজার ৭২৭টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় ১৬ থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।
এতে বোঝা যায়, পূজার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মণ্ডপভিত্তিক পাহারার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক সমন্বয় এবং সীমান্তসংলগ্ন অঞ্চলে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নিরাপত্তা সদস্যদের ভাতা ও লজিস্টিক সহায়তা নিয়ে উদ্বেগ
দুর্গাপূজায় দায়িত্ব পালনকারী আনসার সদস্যদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে।
আনসার মহাপরিচালক জানান, দায়িত্ব পালনের জন্য একজন সদস্য দৈনিক প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা ভাতা পান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সদস্যদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন, গভীর রাত পর্যন্ত অবস্থান, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সদস্যদের দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতাও ব্যাহত হতে পারে।
এ কারণে পূজা উদ্যাপন কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গুজব প্রতিরোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সতর্কতা
ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শুধু বাহিনী মোতায়েন যথেষ্ট নয়। গুজব, ভুল তথ্য, উসকানিমূলক বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অযাচাইকৃত খবরও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।
আনসার মহাপরিচালক জানিয়েছেন, পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে ব্রিফিং এবং বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানে ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষেরও দায়িত্ব রয়েছে। কোনো ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না জেনে তা প্রচার না করা, সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করা এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াতে পারে এমন বক্তব্য থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা কোনো একক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব নয়; এটি সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। ধর্মীয় স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, পূজা উদ্যাপন কমিটি ও সাধারণ মানুষের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
শারদীয় দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় সারা দেশে ২ লাখ ১২ হাজার ১১৮ জন আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েনের তথ্য দিয়েছে বাহিনী। ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপে বাড়তি সদস্য, ১০৪টি স্ট্রাইকিং পেট্রোল এবং ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’ ব্যবহারের মাধ্যমে নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এখন এসব প্রস্তুতির কার্যকর বাস্তবায়ন, গুজব প্রতিরোধ এবং সব ধর্মের মানুষের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবার সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপন করা সম্ভব হবে।

0 Comments