Header Ads Widget

Responsive Advertisement

এলপিজির বাজারে কারসাজি ঠেকাতে ডিসিদের নির্দেশ, বেশি দাম নিলেই ব্যবস্থা : জ্বালানিমন্ত্রী


বিইআরসির নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করতে ডিসিদের নির্দেশ; ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটরের তালিকা, সরবরাহের হিসাব ও বাজার তদারকিতে জোর সরকারের

জাতীয় ডেস্ক

দেশজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে অতিরিক্ত দাম আদায়, সরবরাহে অনিয়ম এবং সম্ভাব্য কৃত্রিম সংকট ঠেকাতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) একগুচ্ছ নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সচিবালয়ে সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, এলপিজির সরবরাহ ও বিতরণ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় জ্বালানি বিভাগ দেশের সব জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অনলাইনে মতবিনিময় করেছে। ওই সভায় বাজার তদারকি, সরবরাহের তথ্য সংগ্রহ এবং অনিয়ম শনাক্ত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রত্যেক জেলা প্রশাসককে নিজ জেলার সব এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অপারেটর, ফ্র্যাঞ্চাইজি, মাস্টার ফ্র্যাঞ্চাইজি, ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলার পর্যায়ে কত পরিমাণ এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে, তার বিস্তারিত হিসাব সংগ্রহ করতে হবে।

সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করা নয়; বরং আমদানিকারক বা অপারেটর থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কোথায় ঘাটতি, অসংগতি বা অনিয়ম হচ্ছে, তা শনাক্ত করা।

ডিলার থেকে অপারেটর—সরবরাহের প্রতিটি ধাপের হিসাব নেওয়া হবে

সরকারের নির্দেশনায় এলপিজির সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অপারেটর থেকে ফ্র্যাঞ্চাইজি, মাস্টার ফ্র্যাঞ্চাইজি, ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলার কত পরিমাণ গ্যাস পেয়েছেন, তা যাচাই করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং সরবরাহের পরিমাণসংক্রান্ত তথ্য যতটা সম্ভব বিস্তারিতভাবে সংগ্রহের কথা বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসকদের অবিলম্বে নিজ নিজ জেলার ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের সঙ্গে বৈঠক করে স্থানীয় বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে পাওয়া তথ্যের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকলে তা আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে হবে। যেমন, কোনো ডিস্ট্রিবিউটরকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সিলিন্ডার সরবরাহের তথ্য থাকলেও ডিলার পর্যায়ে তার তুলনায় অনেক কম গ্যাস পৌঁছানোর প্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

তবে সরবরাহের হিসাবের পার্থক্য পাওয়া গেলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কারসাজির প্রমাণ হয়ে যায় না। পরিবহনজনিত বিলম্ব, মজুতের হিসাব, বিক্রির সময়সীমা এবং নথিপত্রের অসংগতির মতো বিষয়ও যাচাই করে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হবে।

অস্বাভাবিক ঘাটতি দেখা দিলে জ্বালানি বিভাগকে জানাতে হবে

সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো এলাকায় এলপিজির সরবরাহে অস্বাভাবিক ঘাটতি দেখা দিলে কিংবা সরবরাহব্যবস্থার কোনো পর্যায়ে অসংগতি পাওয়া গেলে জেলা প্রশাসকদের বিষয়টি জ্বালানি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।

এ ছাড়া অপারেটর থেকে ডিলার পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য থাকলে সেটিও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় প্রকৃতপক্ষে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে, নাকি সরবরাহের কোনো পর্যায়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে—তা আলাদা করে বোঝার সুযোগ তৈরি হবে।

সরকার জেলা পর্যায় থেকে পাওয়া তথ্য সমন্বয় করে অপারেটর থেকে ডিলার পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছে। এই তথ্যভান্ডার কার্যকর হলে বিভিন্ন জেলার সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনা করা এবং কোথায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন হচ্ছে, তা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।

১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম কত?

অক্টোবর ২০২৬-এর জন্য বিইআরসি বেসরকারি পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে। এর আগের মাসে এই সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।

কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় ভোক্তাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। ১৩ অক্টোবর প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির তথ্য উঠে আসে।

অর্থাৎ, ওই প্রতিবেদনে উল্লেখিত বাজারদর ও বিইআরসির নির্ধারিত দামের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৪৬৩ থেকে ৬৬৩ টাকা। এই পার্থক্য ভোক্তাদের ওপর উল্লেখযোগ্য অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ তৈরি করতে পারে।

তবে এসব দাম পুরো দেশের সব এলাকার জন্য প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া যাবে না। অঞ্চলভেদে সরবরাহ, পরিবহন ও বিক্রয় পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট বিক্রেতা নির্ধারিত মূল্যের বেশি নিচ্ছেন কি না, তা যাচাই করতে বিক্রয়মূল্য, প্রযোজ্য বিধান এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের বিইআরসি আদেশ মিলিয়ে দেখা জরুরি।

এলপিজি ধর্মঘটের ঘোষণার মধ্যে সরকারের তৎপরতা

এলপিজি বাজার তদারকিতে সরকারের এই নির্দেশনা এসেছে ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের ঘোষণার পরপরই। বাংলাদেশ এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ অ্যাসোসিয়েশন লিমিটেড ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি ও সরবরাহ বন্ধ রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

ব্যবসায়ীদের দাবির মধ্যে রয়েছে পরিবেশকদের কমিশন বৃদ্ধি, প্রশাসনিক হয়রানি বন্ধ, সরবরাহব্যবস্থার সমস্যা সমাধান এবং কোম্পানিগুলোর মূল্য পরিবর্তনসংক্রান্ত নীতিমালায় শৃঙ্খলা আনা।

অন্যদিকে জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সতর্ক করেছেন, ধর্মঘট প্রত্যাহার না করলে সরকার আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ রয়েছে; কিন্তু প্রয়োজনীয় জ্বালানির সরবরাহ বন্ধ করে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলা গ্রহণযোগ্য নয়।

এই প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসকদের বাজার তদারকির নির্দেশনাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে ধর্মঘটের ঘোষণা এবং বাজারে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগকে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সরবরাহসংকট, ব্যবসায়ীদের দাবি এবং খুচরা পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির কারণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

সাধারণ ভোক্তাদের জন্য কী অর্থ বহন করছে এই নির্দেশনা?

এলপিজি বাংলাদেশের বহু পরিবারের রান্নার প্রধান জ্বালানি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাস নেই, সেসব এলাকার পরিবারকে সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হয়। রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান এবং ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও এলপিজির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

ফলে সিলিন্ডারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে দৈনন্দিন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে। সরকারের নির্দেশনা কার্যকর হলে ভোক্তারা নির্ধারিত দামে গ্যাস কেনার ক্ষেত্রে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারেন—তবে সেটি নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ের নজরদারি কতটা নিয়মিত ও কার্যকর হচ্ছে তার ওপর।

ভোক্তাদের জন্য কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ:

  • সিলিন্ডার কেনার আগে বিইআরসির সর্বশেষ নির্ধারিত মূল্য যাচাই করা।

  • সম্ভব হলে বিক্রির রসিদ বা মূল্যসংক্রান্ত প্রমাণ সংরক্ষণ করা।

  • অতিরিক্ত মূল্য আদায় বা সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন বা ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষকে জানানো।

  • সম্ভাব্য সংকটের গুজবে আতঙ্কিত হয়ে অস্বাভাবিক দামে সিলিন্ডার কেনার আগে স্থানীয় বাজারের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করা।

সামনে নজর থাকবে বাস্তবায়নের দিকে

এলপিজির বাজার তদারকিতে জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা, সরবরাহব্যবস্থার সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনা এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থার ঘোষণা—সব মিলিয়ে সরকার বাজারে নজরদারি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।

এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কত দ্রুত কার্যকর হয় এবং ভোক্তারা নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার কিনতে পারেন কি না। একই সঙ্গে ১৫ ও ১৬ অক্টোবরের ঘোষিত ধর্মঘট প্রত্যাহার হয় কি না, সেটিও সরবরাহ পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এলপিজির বাজারে অতিরিক্ত দাম ও সরবরাহের অনিয়ম ঠেকাতে সরকার জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। উদ্যোগটি কার্যকর করতে নিয়মিত বাজার তদারকি, সরবরাহের হিসাব যাচাই, স্বচ্ছ মূল্যতথ্য এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

Post a Comment

0 Comments