জাতীয় ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে হেনস্তার অভিযোগের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের হয়রানির ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবিও নতুন করে সামনে এসেছে।
১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনার বিরুদ্ধেও আইনি প্রক্রিয়া নেওয়া হবে। তিনি এর আগে ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের হেনস্তার ঘটনায় শুরু হওয়া আইনি প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঘটনাটি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তুলে ধরতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মিশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জেএফকে বিমানবন্দরে কী ঘটেছিল?
প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দর থেকে হুইলচেয়ারে বের হওয়ার সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দিকে কয়েকজন ব্যক্তি এগিয়ে গিয়ে উচ্চস্বরে স্লোগান দেন। তাঁকে উদ্দেশ করে ইংরেজিতে ‘ইউ আর আ টেররিস্ট’ এবং ‘হোয়াই ইউ কাম হিয়ার’সহ বিভিন্ন আপত্তিকর মন্তব্য করতে শোনা যায়। বিক্ষোভকারীরা তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে অভিযোগও তোলেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। অভিযোগ উঠেছে, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রবাসী সমর্থক ছিলেন। তবে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় ও তাঁদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এবং আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এ অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
ড. ইউনূসের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, তিনি ঘটনাটিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশের দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা জানান, ড. ইউনূসের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং তিনি চাইলে দূতাবাস আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেবে।
সরকারের বক্তব্য: আইনি প্রক্রিয়া নেওয়া হবে
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিদেশে ড. ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি এ ধরনের আচরণকে গ্রহণযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করেন এবং বিদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে বিষয়টি বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া হবে না বলে জানান।
তাঁর বক্তব্যে আরও উঠে আসে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের যে ধরনের ভিভিআইপি মর্যাদা বা প্রটোকল পাওয়ার কথা, তাতে কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সরকার তা খতিয়ে দেখবে।
তবে এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একদিকে রয়েছে বিমানবন্দরে বিক্ষোভকারীদের আচরণ ও সম্ভাব্য আইনভঙ্গের অভিযোগ; অন্যদিকে রয়েছে ড. ইউনূসের সফরসংক্রান্ত নিরাপত্তা ও প্রটোকল ব্যবস্থাপনা। কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের ঘাটতি বা অপরাধ ঘটেছে, তা যথাযথ অনুসন্ধানের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা সম্ভব।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কী বলা হয়েছে?
ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে দলটির সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, তিনি ভিডিওতে দেখা ব্যক্তিদের কাউকে চিনতে পারেননি এবং এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের কেউ জড়িত বলে তাঁর জানা নেই।
অর্থাৎ, সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপের কথা বলা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে তদন্ত প্রয়োজন। ভিডিওতে কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি এবং তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় বা সাংগঠনিক নির্দেশনার মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে অতিরিক্ত প্রমাণ লাগতে পারে।
একটি দায়িত্বশীল তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাইয়ের মতো বিষয় বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
বিদেশে বাংলাদেশিদের হেনস্তা: আগের ঘটনাগুলোও আলোচনায়
ড. ইউনূসকে ঘিরে নিউইয়র্কের ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বিদেশে বাংলাদেশি রাজনৈতিক নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হয়রানি নিয়ে আগেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেন। একই বছরের ২৪ জুন যুক্তরাজ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জেএফকে বিমানবন্দরে এনসিপি নেতা আখতার হোসেনকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে জেনেভা বিমানবন্দরে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।
এসব ঘটনার ধরন, প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এক নয়। তাই সব ঘটনাকে একই সংগঠন বা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে না। তবে বিদেশে রাজনৈতিক মতবিরোধের প্রকাশ কখন আচরণগত সীমা অতিক্রম করছে, তা নিয়ে আলোচনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে।
কূটনৈতিক উদ্যোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্ন
ড. ইউনূসের ঘটনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরতে বলেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে ঘটনার নথিভুক্তি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী তদন্তের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বিদেশের মাটিতে সংঘটিত কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপের ধরন নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, প্রমাণের পর্যাপ্ততা এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারের ওপর। বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেট তথ্য সরবরাহ, প্রয়োজনীয় যোগাযোগ এবং কূটনৈতিক সহায়তা দিতে পারে; কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত সেখানকার আইনগত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিদেশে বাংলাদেশি নাগরিক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিলে দূতাবাসগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় এবং ঘটনার পরবর্তী অনুসরণ কার্যকর রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রত্যেক ঘটনার তথ্য যাচাই করে জনসমক্ষে বক্তব্য দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।

0 Comments