ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় | ডেস্ক রিপোর্ট
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রধান ফটকে আবারও পুরোনো নাম ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা নামফলক সরিয়ে সেখানে পুনরায় ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ নাম স্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হলের প্রধান ফটক থেকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা মুছে ফেলার কার্যক্রম শুরু হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি কেন্দ্রীয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়নি। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানিয়েছেন, আগের নামগুলো বহাল রাখার বিষয়ে সিনেটে সিদ্ধান্ত হওয়ায় পুরোনো নাম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ফলে প্রধান ফটকের নামফলকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা থাকার পর তা সরিয়ে আবার ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নামফলক সরানো নিয়ে হল সংসদে ভিন্ন বক্তব্য
নামফলক সরানোর বিষয়টি নিয়ে হল সংসদের নেতাদের মধ্যেও আলোচনা তৈরি হয়েছে। হল সংসদের বহিরাঙ্গন ক্রীড়া সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নামফলক সরানোর ছবি প্রকাশ করে জানান, হল প্রশাসনের পক্ষ থেকেই আগের নাম ফিরিয়ে আনার কাজ হচ্ছে।
তবে হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) মো. মুসলিমুর রহমানের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁর দাবি, হল সংসদকে আগে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি যে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা নাম সরিয়ে ফেলা হবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারেন বলে জানান।
অর্থাৎ নামফলক সরানোর প্রক্রিয়া নিয়ে হল সংসদের ভেতরেও তথ্যপ্রাপ্তি ও প্রশাসনিক যোগাযোগের প্রশ্ন উঠেছে।
শেখ মুজিবের নামও পরিবর্তনের দাবি
শুধু ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি সরিয়ে আগের নাম ফিরিয়ে আনার বিষয়েই হল সংসদের অবস্থান সীমাবদ্ধ নয়। ভিপি মো. মুসলিমুর রহমান জানিয়েছেন, হল সংসদ শেখ মুজিবুর রহমানের নামও পরিবর্তনের পক্ষে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হলটির নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ অথবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নামে রাখা—দুই ক্ষেত্রেই তাদের আপত্তি নেই। তাদের মূল দাবি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নাম পরিবর্তন করা।
এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তনের দাবি তুলেছিল। পরে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ফোরামে আলোচনাতেও আসে।
৮০০ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরের দাবি
হল সংসদের ভিপির ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হলটির নাম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এ দাবির সমর্থনে প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর স্বাক্ষরসংবলিত একটি স্মারকলিপি তৎকালীন উপাচার্যের কাছে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট অধিবেশনে উত্থাপনের পর অধিকতর বিবেচনার জন্য সিন্ডিকেটে পাঠানো হয়েছিল।
তবে নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ফোরামে চূড়ান্ত অনুমোদন প্রয়োজন এবং সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে কি না—এটাই বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
কীভাবে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি এলো
শরীফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর পর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তনের দাবি সামনে আসে। পরে ২০ ডিসেম্বর রাতে শিক্ষার্থীদের একাংশ হলের প্রধান ফটকের পুরোনো নামফলক সরিয়ে সেখানে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ লেখা স্থাপন করেন। এ সময় ক্রেন ব্যবহার করে পুরোনো নাম মুছে নতুন নাম লেখার ঘটনাও ঘটে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার সুপারিশের বিষয়টি সামনে আসে। একই সময়ে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম পরিবর্তনের বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছিল।
তবে এসব সুপারিশকে চূড়ান্ত নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। সাম্প্রতিক প্রশাসনিক বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয়ভাবে পুরোনো নাম বহাল রাখার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ায় হলের প্রধান ফটকেও আগের নাম ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
সিনেট ও সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ প্রক্রিয়ায় সিনেট ও সিন্ডিকেটের ভূমিকা থাকায় বিষয়টি শুধু একটি নামফলক পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব উঠলেও সেগুলোর আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ও বাস্তবায়নের প্রশ্ন আলাদা।
উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের নামগুলো বহাল রাখার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এখনও নাম পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে পার্থক্যটি নতুন করে সামনে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে কোন নাম?
বর্তমান পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তথ্যেও হলটির নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান হল’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। হলটি ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এর নামকরণ করা হয়।
অন্যদিকে, ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামটি মূলত শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে হলের প্রধান ফটকে স্থাপন করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না থাকায় সেটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারি নাম হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
হল প্রাধ্যক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
নামফলক পরিবর্তনের বিষয়ে শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফলে হল প্রশাসনের সরাসরি ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের বক্তব্য এবং হল সংসদের বক্তব্য—এই তিনটি দিক থেকেই ঘটনাটি দেখা হচ্ছে।

0 Comments