Header Ads Widget

Responsive Advertisement

বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান শুরু, জ্বালানি আমদানি কমানোর আশা


নিজস্ব প্রতিবেদক | জাতীয় ডেস্ক

বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করা, জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে সরকার।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় বাংলাদেশের মেরিটাইম ও অফশোর শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ‘অষ্টম বিমক্স-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর ভারত ও মিয়ানমার তাদের সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে ছিল। এখন বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। সমুদ্রের বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর মধ্যে সমন্বয়, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সমুদ্রসম্পদে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

বাংলাদেশ নদী ও সমুদ্রসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও এসব সম্পদের পূর্ণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনো কাজে লাগানো যায়নি বলে অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী।

তাঁর মতে, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে সমুদ্রসম্পদ দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। তবে সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও সামুদ্রিক প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।

সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান একটি প্রযুক্তিনির্ভর ও ব্যয়সাপেক্ষ কার্যক্রম। সম্ভাব্য মজুত নির্ধারণ, ভূতাত্ত্বিক তথ্য বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান কূপ খনন এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন সম্ভব কি না—এসব ধাপ পেরিয়ে তবেই কোনো আবিষ্কারকে উৎপাদনযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

এ কারণে অনুসন্ধান শুরু হওয়ার ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর ভিত্তিতে এখনই দেশে নতুন তেল-গ্যাসের বাণিজ্যিক মজুত নিশ্চিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমানোর সুযোগ

দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও গৃহস্থালি খাতে জ্বালানির চাহিদা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়। অভ্যন্তরীণ গ্যাসের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

বঙ্গোপসাগরে অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে ভবিষ্যতে তা দেশের জ্বালানি সরবরাহে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর জন্য পর্যাপ্ত ভূতাত্ত্বিক তথ্য, অনুসন্ধান সফলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনের সক্ষমতা প্রয়োজন।

সমুদ্রে অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে চুক্তির শর্ত, রাষ্ট্রের রাজস্বপ্রাপ্তি, উৎপাদিত সম্পদের ভাগ, পরিবেশগত দায় এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অফশোর অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বিশেষায়িত জাহাজ, উন্নত ভূকম্পন জরিপ প্রযুক্তি, সমুদ্রতল বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান কূপ খনন এবং বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য কার্যকর বিনিয়োগ কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসন্ধানে আগ্রহী হয় এবং একই সঙ্গে দেশের আর্থিক ও কৌশলগত স্বার্থ সংরক্ষিত থাকে।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে:

  • প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র: যোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে আকৃষ্ট করার মতো স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত শর্ত নির্ধারণ।

  • চুক্তির স্বচ্ছতা: ব্যয় পুনরুদ্ধার, মুনাফা বণ্টন, কর এবং রাষ্ট্রের প্রাপ্য অংশের নিয়ম স্পষ্ট রাখা।

  • প্রযুক্তি ও দক্ষতা: দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি।

  • ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা: অনুসন্ধান ব্যর্থ হলে আর্থিক দায় কীভাবে বণ্টিত হবে, তা আগেই নির্ধারণ।

  • জাতীয় স্বার্থ: দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা।

বন্দর উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার

সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পাশাপাশি দেশের বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও তুলে ধরেন শেখ রবিউল আলম।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাতারবাড়ীতে আন্তর্জাতিক মানের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ চলছে, যা ২০৩০ সালে চালুর লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দরকে আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বন্দর অবকাঠামোর উন্নয়ন সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রমের পাশাপাশি সামুদ্রিক পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা, জাহাজ পরিচালনা, যন্ত্রপাতি পরিবহন এবং সংশ্লিষ্ট সেবা খাতেরও প্রয়োজন হয়।

তবে বন্দর উন্নয়ন ও অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান পৃথক কার্যক্রম। অবকাঠামোগত অগ্রগতি অনুসন্ধানের ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা নিজে থেকেই তেল-গ্যাসের মজুত নিশ্চিত করে না।

সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর নিয়েও বক্তব্য

বিশ্বজুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ চলছে। এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ন্যায্যতার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ জরুরি হলেও এ রূপান্তর রাতারাতি সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের জন্য এখানে দ্বৈত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতের চাহিদা মেটাতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ প্রয়োজন, অন্যদিকে পরিবেশগত দায় কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোও জরুরি।

তাই সম্ভাব্য দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধানের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি সাশ্রয়, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গোপসাগরের সম্পদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অনুসন্ধান থেকে উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, জবাবদিহি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

Post a Comment

0 Comments