জাতীয় ও প্রযুক্তি ডেস্ক
উদ্ভাবন, প্রযুক্তি, গবেষণা ও নতুন ধারণাকে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপ দেওয়ার সক্ষমতায় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানে সামান্য উন্নতি হয়েছে। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স (GII) ২০২৬ অনুযায়ী, ১৩৯টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশ ১০৫তম স্থানে রয়েছে। আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের সূচকে দেশটির অবস্থান ছিল ১০৬তম। তবে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়াকে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত, কারণ গবেষণা, মানবসম্পদ, ব্যবসায়িক উদ্ভাবন এবং উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে বাংলাদেশের সামনে এখনো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
বিশ্ব মেধাস্বত্ব সংস্থা—ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশন (WIPO) প্রকাশিত এই সূচক বিশ্বের বিভিন্ন অর্থনীতির উদ্ভাবনী সক্ষমতা মূল্যায়ন করে। এতে গবেষণা ও উন্নয়ন, শিক্ষা, অবকাঠামো, বাজার ও ব্যবসার পরিবেশ, জ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম এবং সৃজনশীল উৎপাদনসহ প্রায় ৮০টি সূচক বিবেচনা করা হয়।
এক ধাপ অগ্রগতি, কিন্তু অবস্থান এখনো নিচের দিকে
২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৫তম। ২০২৪ ও ২০২৫—উভয় বছরেই দেশটি ছিল ১০৬তম স্থানে। অর্থাৎ সাম্প্রতিক সময়ে অবস্থানের বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেনি।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানেও ওঠানামা রয়েছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে দেশটি ১১৬তম অবস্থানে ছিল। ২০২২ সালে উন্নতি করে ১০২তম স্থানে ওঠে। পরবর্তী সময়ে আবার অবস্থানের অবনতি ঘটে এবং ২০২৩ সালে ১০৫তম, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ১০৬তম স্থানে ছিল।
এই ধারাবাহিকতা দেখায়, বাংলাদেশ উদ্ভাবনী সক্ষমতা বৃদ্ধির কিছু অগ্রগতি অর্জন করলেও তা এখনো স্থায়ী ও ব্যাপক উন্নয়নে রূপ নেয়নি। তাছাড়া সূচকের পদ্ধতি এবং বিভিন্ন দেশের তথ্যের প্রাপ্যতা বছরে বছরে পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে শুধু অবস্থানের পরিবর্তন দিয়ে কোনো দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতার পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।
আয়ভিত্তিক ও আঞ্চলিক অবস্থান কী বলছে?
আয়ভিত্তিক তুলনায় বাংলাদেশ ২০২৬ সালের সূচকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের ৩৬টি অর্থনীতির মধ্যে ২০তম। অন্যদিকে মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ১১টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম।
এ থেকে বোঝা যায়, দেশের উদ্ভাবনী সক্ষমতা শুধু উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে তুলনায় পিছিয়ে নেই; একই ধরনের আয়স্তরের দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে।
অঞ্চলভিত্তিক অবস্থান উন্নত করতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি গবেষণার মান, উচ্চশিক্ষার সঙ্গে শিল্পখাতের সংযোগ, নতুন ব্যবসার অর্থায়ন এবং উদ্ভাবন থেকে বাজারযোগ্য পণ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
উদ্ভাবনের ফলাফলে তুলনামূলক ভালো, বিনিয়োগ ও সহায়ক পরিবেশে দুর্বলতা
সূচকের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ ও পরিবেশের তুলনায় বাংলাদেশ কিছুটা ভালো ফলাফল তৈরি করতে পারছে। ২০২৬ সালের সূচকে উদ্ভাবনের উপকরণ বা Innovation Inputs-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১১৫তম। উদ্ভাবনের ফলাফল বা Innovation Outputs-এ অবস্থান ৯২তম।
উদ্ভাবনের উপকরণের মধ্যে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ, শিক্ষা, অবকাঠামো, প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসার পরিবেশের মতো বিষয় বিবেচিত হয়। অন্যদিকে ফলাফলের ক্ষেত্রে জ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎপাদন এবং সৃজনশীল কার্যক্রমের মতো বিষয় গুরুত্ব পায়।
দুই অবস্থানের এই ব্যবধান ইঙ্গিত করে, সীমিত সম্পদ ও সহায়ক পরিবেশের মধ্যেও বাংলাদেশ কিছু উদ্ভাবনী ফলাফল তৈরি করছে। তবে এটিকে গবেষণা ও উন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না। বরং বিদ্যমান সম্ভাবনাকে আরও বড় অর্থনৈতিক ফলাফলে রূপ দিতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা এতে স্পষ্ট হয়।
মানবসম্পদ ও গবেষণায় বড় চ্যালেঞ্জ
২০২৫ সালের সূচকে বাংলাদেশের কয়েকটি দুর্বল ক্ষেত্র বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছিল। মানবসম্পদ ও গবেষণায় দেশটির অবস্থান ছিল ১৩৩তম, ব্যবসায়িক পরিশীলনে ১২৯তম এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায় ১০৯তম।
এই অবস্থানগুলো উদ্ভাবনী অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি কিছু সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। দক্ষ মানবসম্পদ, মানসম্মত গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা এবং নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা ব্যবসার জন্য উপযোগী পরিবেশ ছাড়া উদ্ভাবনের অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন।
তবে এসব ক্ষেত্রের ২০২৫ সালের অবস্থানকে ২০২৬ সালের অপরিবর্তিত র্যাঙ্কিং হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। বছরভিত্তিক সূচক ও তথ্য আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গবেষণাপত্র বাড়লেও পেটেন্ট ও বিনিয়োগে উদ্বেগ
WIPO-এর ২০২৬ সালের বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার সংখ্যা ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এটি গবেষণামূলক কার্যক্রমে ইতিবাচক অগ্রগতির একটি ইঙ্গিত।
তবে একই তথ্যভান্ডারে ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল চুক্তির সংখ্যা ৪৮ শতাংশ কমার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পেটেন্ট আবেদনের ক্ষেত্রেও ২০২১ থেকে ২০২৩ সময়কালে ২৯ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাসের তথ্য রয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো ভিন্ন সময়সীমা ও ভিন্ন ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এগুলোকে সরাসরি একই প্রবণতার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। তবু গবেষণার ফলাফলকে বাণিজ্যিক পণ্য, প্রযুক্তি, নতুন প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্বে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে অর্থায়ন ও বাজারসংযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে।
গবেষণাপত্র প্রকাশের পাশাপাশি উদ্ভাবনকে বাস্তব অর্থনীতিতে কার্যকর করতে প্রয়োজন পেটেন্ট-সংক্রান্ত সহায়তা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ব্যবসায়িক পরামর্শ, পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং ঝুঁকি নিতে আগ্রহী বিনিয়োগকারী।
বিশ্বের শীর্ষ উদ্ভাবনী দেশ কারা?
২০২৬ সালের বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে শীর্ষ তিন অবস্থানে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, সুইডেন ও যুক্তরাষ্ট্র। চীন রয়েছে দশম স্থানে এবং ভারত ৩৮তম স্থানে।
এই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, উদ্ভাবনী সক্ষমতা গড়ে তুলতে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার বা ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়। গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা এবং নতুন ধারণাকে বিশ্ববাজারে নিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ভারতের অবস্থান বাংলাদেশের জন্য একটি প্রাসঙ্গিক আঞ্চলিক তুলনা। তবে দুই দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, বাজারের আকার ও গবেষণা-পরিবেশ এক নয়; তাই র্যাঙ্কিংয়ের ব্যবধানকে সরলভাবে কোনো একটি নীতির সাফল্য বা ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত হবে না।
বিশ্লেষণ: বাংলাদেশের সামনে কোন পদক্ষেপগুলো গুরুত্বপূর্ণ?
১. গবেষণা ও উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ: বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ নয়, গবেষণার ফলাফলকে পণ্য ও সেবায় রূপ দেওয়ার ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
২. শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগ: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা যেন বাস্তব শিল্পসমস্যার সমাধান করে, সে জন্য যৌথ গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষকদের সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
৩. স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী উদ্যোগে অর্থায়ন: প্রাথমিক পর্যায়ের প্রযুক্তি উদ্যোগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মূলধন, পরীক্ষামূলক প্রকল্পের অনুদান এবং স্বচ্ছ বিনিয়োগব্যবস্থা প্রয়োজন। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারে প্রবেশ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের বাধাও কমাতে হবে।
৪. মেধাস্বত্ব ও পেটেন্ট ব্যবস্থাকে কার্যকর করা: উদ্ভাবকের অধিকার রক্ষা, পেটেন্ট আবেদন সম্পর্কে সচেতনতা, আবেদনপ্রক্রিয়ায় সহায়তা এবং গবেষণার বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে।
৫. ডিজিটাল দক্ষতা ও আঞ্চলিক অংশগ্রহণ: শহরের বাইরে থাকা তরুণদেরও প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, ইন্টারনেট, উপযুক্ত যন্ত্রপাতি এবং বাস্তব কাজের সুযোগ দিতে হবে। সফটওয়্যার, কৃষিপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা প্রযুক্তি ও স্থানীয় সমস্যার ডিজিটাল সমাধানে নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
৬. ফলাফল পরিমাপ ও জবাবদিহি: শুধু প্রশিক্ষণ, কর্মশালা বা প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে উদ্ভাবনের অগ্রগতি বিচার করা যথেষ্ট নয়। নতুন পণ্য, পেটেন্ট, প্রযুক্তি রপ্তানি, গবেষণার বাণিজ্যিক ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা এবং টিকে থাকা নতুন প্রতিষ্ঠানের মতো ফলাফলও পরিমাপ করা প্রয়োজন।
বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচক ২০২৬-এ বাংলাদেশের ১০৫তম অবস্থান এক ধাপ অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও এটি আত্মতুষ্টির কারণ নয়। বরং মানবসম্পদ, গবেষণা, ব্যবসায়িক উদ্ভাবন এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
বাংলাদেশের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ কেবল নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করা নয়; বরং নিজস্ব জ্ঞান, গবেষণা ও সৃজনশীলতাকে উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতামূলক পণ্য, প্রযুক্তি রপ্তানি এবং কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া। ধারাবাহিক বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্যকর নীতিসহায়তা এবং উদ্ভাবকদের জন্য বাস্তব বাজার তৈরি করা গেলে এই অবস্থানের আরও উন্নতি সম্ভব হতে পারে।

0 Comments