মৌলভীবাজার | ডেস্ক রিপোর্ট
মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শামীমা খন্দকারের অপসারণ ও বদলির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন জেলা পরিষদের ঠিকাদাররা। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে মৌলভীবাজার প্রেসক্লাবের সামনে জেলা পরিষদের ঠিকাদারদের আয়োজনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ভূমিকার কারণে ঠিকাদাররা নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়ছেন। তাদের দাবি, এসব কারণে একদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে ঠিকাদারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন জেলা পরিষদের ঠিকাদার তোফায়েল ইসলাম তোহেল, আনিছুজ্জামান বায়েছ, আতাউর রহমানসহ অন্যরা।
আর্থিক অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ
মানববন্ধনকারীদের লিখিত অভিযোগে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ, বিল অনুমোদন এবং জেলা পরিষদের আওতাধীন সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।
ঠিকাদারদের দাবি, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নির্ধারিত কাজের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা এবং সেই অর্থ না দিলে বিল বা প্রকল্প-সংক্রান্ত ফাইল আটকে রাখার মতো ঘটনা ঘটছে। তাদের অভিযোগ, কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম দেখিয়ে ঠিকাদারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের কোনোটি তদন্ত বা আদালতের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া পর্যালোচনা প্রয়োজন।
জলমহাল ও দোকানপাট নিয়েও অভিযোগ
ঠিকাদাররা জেলা পরিষদের আওতাধীন জলমহাল এবং বিভিন্ন দোকান-কোঠা পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, জেলা পরিষদের একজন কর্মচারীর মাধ্যমে এসব ক্ষেত্রে উৎকোচ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।
এ ছাড়া জেলা পরিষদের ডাকবাংলোগুলোর স্টাফ নিয়োগেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি আগের সরকারের সময়ে বিভিন্ন ফাইল পর্যালোচনা করলে কথিতভাবে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলেও লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এসব অভিযোগেরও স্বাধীন তদন্ত বা নিরীক্ষার মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে ঠিকাদাররা শামীমা খন্দকারের নিয়োগ ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তারা দাবি করেন, তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং ওই সময়কার রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেন, অতীতে জেলা পরিষদের কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমন্বয়ে অনিয়মের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল এবং সেই ধারাবাহিকতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
তবে কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্ব পালন করা নিজেই অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ নয়। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে নিয়োগের নথি, দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের কাজ ও পিপিআর নিয়ে প্রশ্ন
ঠিকাদারদের অন্যতম অভিযোগ হলো—অনুমোদিত সিডিউল অনুযায়ী কাজ না করিয়ে প্রকল্পের বিভিন্ন আইটেম পরিবর্তন করে কাজ করানো হচ্ছে। তাদের দাবি, এ ধরনের পরিবর্তন যথাযথ অনুমোদন ও বিধি অনুসরণ ছাড়া করা হলে সরকারি ক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তারা অভিযোগ করেন, কাজ শেষ হওয়ার পরও বিভিন্ন অজুহাতে বিল আটকে রাখা হয় এবং পরে অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করা হয়।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো প্রকল্পে আইটেম পরিবর্তন বা কাজের ধরন পরিবর্তন আইনসম্মত কি না, তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদিত প্রাক্কলন, দরপত্রের শর্ত, কার্যাদেশ, সংশোধিত অনুমোদন এবং পরিমাপ বইসহ সংশ্লিষ্ট নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
কর্মকর্তার বক্তব্য
মানববন্ধনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা খন্দকার অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন।
তিনি বলেন, ঠিকাদারদের বিলের বিষয়টি তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবেই পরিচালনা করছেন।
অর্থাৎ, অভিযোগকারী ঠিকাদারদের বক্তব্যের সঙ্গে কর্মকর্তার বক্তব্যের সরাসরি বিরোধ রয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত, প্রকল্পের নথি যাচাই এবং প্রয়োজন হলে আর্থিক নিরীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সরকারি জেলা পরিষদের ওয়েবসাইটেও শামীমা খন্দকারকে বর্তমানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বদলির দাবি
মানববন্ধনে বক্তারা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শামীমা খন্দকারকে মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ থেকে বদলি বা অপসারণের দাবি জানান।
মানববন্ধন শেষে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। একই সঙ্গে শ্রম, কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়, সংসদ সদস্য, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সিলেট বিভাগের বিভাগীয় কমিশনারের কাছেও লিখিত অভিযোগ পাঠানোর কথা জানান।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই এখন মূল বিষয়
মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। সরকারি ওয়েবসাইটে জেলা পরিষদের উন্নয়ন কার্যক্রম, বাজেট, টেন্ডার ও প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্যের আলাদা বিভাগ রয়েছে।
তাই অভিযোগগুলোর ব্যাপারে দ্রুত কোনো পক্ষকে দায়ী না করে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের টেন্ডার নথি, কার্যাদেশ, কাজের পরিমাপ, বিল-ভাউচার, ফাইল চলাচল এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।

0 Comments