রাজধানীর গ্যাসসংকট, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম, পরিবহনব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা, ছিনতাই, হাসপাতালকেন্দ্রিক অনিয়ম এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটের প্রতিবাদে গণবিক্ষোভ দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী। তিনি বলেছেন, শাহবাগ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি শহর, অলিগলি ও জনপদে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে চার দফা দাবিতে আয়োজিত গণবিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে ঢাকার নাগরিক দুর্ভোগের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য, বাজার সিন্ডিকেট, গণপরিবহন, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মতো জাতীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ইস্যু উঠে আসে।
নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও সদস্য সচিবসহ দলের নেতারা কাজ করছেন। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করে রাষ্ট্র ও নগরব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাই তাঁদের লক্ষ্য। ঢাকাকে নতুনভাবে গড়ে তোলার আন্দোলন রাজধানীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন শহর ও জনপদে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
গ্যাসসংকট ও এলপিজির বাড়তি দাম নিয়ে ক্ষোভ
রাজধানীর বাসিন্দাদের দৈনন্দিন দুর্ভোগের প্রসঙ্গ তুলে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নেই। ফলে পরিবারগুলোকে বিকল্প হিসেবে ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। আবার যারা এলপিজি সিলিন্ডার কিনছেন, তাঁদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তাঁর দাবি, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও কোথাও কোথাও ক্রেতাদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। চকবাজার এলাকায় গিয়ে মানুষকে লাকড়ি দিয়ে রান্না করতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি রাজধানীর জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন সামনে আনেন। বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকলে বিকল্প জ্বালানির ওপর পরিবারের ব্যয় বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য রান্নার জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ মাসিক পারিবারিক বাজেটে নতুন চাপ তৈরি করে।
হাসপাতাল, ছিনতাই ও নাগরিক নিরাপত্তার সংকট
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এনসিপির এই নেতা বলেন, মুগদা হাসপাতালে সিন্ডিকেট ও টেন্ডারবাজির কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা ভোগান্তিতে রয়েছেন। উত্তরা ও মিরপুর এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি মিরপুরের রাড্ডা হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনাও তুলে ধরেন।
যাত্রাবাড়ীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দিনের বেলাতেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।
তাঁর বক্তব্যে হাসপাতালকেন্দ্রিক অনিয়ম ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। কারণ, চিকিৎসা নিতে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের যদি অতিরিক্ত অর্থ, দালালচক্র কিংবা অনিয়মের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে নাগরিকের মৌলিক সেবা পাওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়। একইভাবে জনবহুল এলাকায় ছিনতাই ও অপরাধের আশঙ্কা বাড়লে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ যাত্রীদের স্বাভাবিক চলাচলও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
যানজট, ময়লার ভাগাড় ও নর্দমার পানিতে বিপর্যস্ত ঢাকা
রাজধানীর বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে ময়লার ভাগাড়, তীব্র যানজট, নর্দমার পানি এবং অটোরিকশার আধিক্য দেখেছেন বলে জানান নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী। তাঁর মতে, ঢাকার নাগরিক জীবনে স্বস্তি ও নিরাপত্তার যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ঢাকার সমস্যাগুলো কেবল যানজট বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাব, ফুটপাত দখল, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য সংগ্রহে অনিয়ম—সব মিলিয়ে নগরবাসীর জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, বৃষ্টির সময় নর্দমার পানি রাস্তায় উঠে এলে যান চলাচল ব্যাহত হয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রোগজীবাণু ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়। আবার যানজটে প্রতিদিন কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি ব্যয় ও পণ্য পরিবহনের খরচও বাড়ে। এসব সমস্যার সমাধানে বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক সিটি প্রশাসন প্রয়োজন।
জুলাইয়ের বিচার ও সংস্কার বাস্তবায়নে অনড় অবস্থান
নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গঠনের যে প্রত্যয় তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে এনসিপি পিছিয়ে যাবে না। জুলাইয়ে নিহত ব্যক্তিদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শহীদ উসমান হাদির হত্যার বিচারও দাবি করেন তিনি।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অসংখ্য মানুষের রক্তের বিনিময়ে দেশে সংস্কার বাস্তবায়নের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে তাঁরা একচুলও সরে আসবেন না। বরং দ্বিগুণ গতিতে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবেন।
তাঁর বক্তব্যে জুলাই সনদকে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে নয়, বরং গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। তবে সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন কোন প্রস্তাব কীভাবে কার্যকর হবে, সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনি প্রক্রিয়া কী হবে—এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেবে এনসিপি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এনসিপির অংশগ্রহণের বিষয়ে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটি গঠিত হয়েছিল এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও এনসিপি এককভাবে অংশগ্রহণ করবে।
তিনি জানান, ইতোমধ্যে কয়েকটি সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেও প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া কাউন্সিলর, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান এবং পৌরসভার বিভিন্ন পদে আগ্রহীদের এনসিপিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর দাবি, দলটির সঙ্গে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, দখলদারত্ব ও মাদকের কোনো সম্পর্ক নেই। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান এবং শহীদ উসমান হাদির আজাদি সংগ্রামের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
দ্রব্যমূল্য নিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে তাঁরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং একটি ডেটা সার্ভে করেছেন। তাঁর দাবি, দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন বন্দর, বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি করা পণ্যের বাজারে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের কারণে শ্রমজীবী মানুষ, কুলি-মজুর ও কৃষকসহ সাধারণ জনগোষ্ঠীর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে।
বাজার সিন্ডিকেটের অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি মেঘনা গ্রুপ ও বসুন্ধরা গ্রুপের নাম উল্লেখ করেন। তাঁর অভিযোগ, গত কয়েক মাস ধরে এসব ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে প্রতি মাসে পাঁচ মিলিয়ন ডলার করে অর্থ দিচ্ছে। এই অভিযোগের পক্ষে তিনি সমাবেশে কোনো নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য; সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা দলের বক্তব্য এবং স্বাধীন তদন্ত ছাড়া একে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা, আমদানি ব্যয়, সরবরাহব্যবস্থা, মজুতদারি ও বাজার তদারকির কার্যকারিতা—এসব বিষয় মূল্যবৃদ্ধির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পণ্যের আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত একাধিক স্তরে অস্বচ্ছতা বা অস্বাভাবিক মুনাফা যুক্ত হলে শেষ পর্যন্ত তার চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর। এ কারণে বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, আমদানি ও মজুতের তথ্য প্রকাশ এবং নিয়মিত তদারকি জরুরি।
অটোরিকশা বন্ধ ও হকার উচ্ছেদ নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকায় অটোরিকশা বন্ধ এবং হকার উচ্ছেদের উদ্যোগের বিষয়ে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, তাঁরা জনবান্ধব ব্যবস্থার পক্ষে। তবে গণপরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে অটোরিকশা বন্ধ করা হলে কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত আরও কঠিন হবে।
তিনি বলেন, অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করতে হলে তার আগে দ্রুতগতির ও গণবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দামি গাড়ি কেনার সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থে বড় বড় গাড়ির ব্যবস্থা করা হলেও সাধারণ মানুষ সন্তানকে হাসপাতালে নেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় যাতায়াত সুবিধা পাচ্ছে না। তাঁর অভিযোগ, প্রভাবশালী ও বিত্তশালী শ্রেণির জন্য গাড়ির ব্যবস্থা থাকলেও সাধারণ মানুষের পরিবহন সংকটের সমাধান হচ্ছে না।
টোকিও, লন্ডন ও নিউইয়র্কের মতো শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে তিনি ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা আধুনিক করার দাবি জানান। তাঁর ভাষায়, লক্কড়-ঝক্কড় বাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।
এই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগের সঙ্গে বিকল্প জীবিকা এবং পরিবহন পরিকল্পনাকে যুক্ত করা। কারণ, অটোরিকশা চালক ও হকারদের জীবিকা যেমন বিবেচনায় রাখতে হবে, তেমনি পথচারী, যাত্রী ও নগরবাসীর চলাচলের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পিত পুনর্বাসন, নির্দিষ্ট বিক্রয় এলাকা এবং পর্যাপ্ত গণপরিবহন ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারে না।
তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়ে সরকারের সমালোচনা
তরুণদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী বলেন, বিএনপি এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, গত আট মাসে উল্টো এক কোটি তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি সরকারের প্রতি তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বলেন, সরকার যদি তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এনসিপি ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
তাঁর এই বক্তব্যে কর্মসংস্থানকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান এবং শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু চাকরির সংখ্যা ঘোষণা নয়, বাস্তবে কতজনের জন্য স্থায়ী ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড।
নিরাপত্তাহীনতা ও তরুণদের ওপর হামলার অভিযোগ
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশে মৃত্যুর মিছিল বড় হচ্ছে। জুলাইয়ের ১ হাজার ৪০০ শহীদের কথা উল্লেখ করার পাশাপাশি শহীদ উসমান হাদির হত্যার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
তিনি ইনকিলাব মঞ্চের উসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন এবং তাশরীফ নামে আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিজেদেরও সংগঠিত হতে হবে।
এ সময় ছাত্রশক্তির সহযোদ্ধা আলিফের ওপর হামলার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর দাবি, আলিফের একটি চোখ নষ্ট হয়ে গেছে এবং তিনি এখন এক চোখ দিয়ে দেখতে পান। সমাবেশে আলিফের উপস্থিতির কথা জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, তরুণদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তাঁদের নিরাপত্তা কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঘটনা, চিকিৎসা নথি, মামলা ও তদন্তের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক সহিংসতা বা হামলার অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করা জরুরি।
সরকারের প্রতি চার দফা দাবির পাশাপাশি আরও আহ্বান
বক্তব্যের শেষ দিকে নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী সরকারের প্রতি কয়েকটি বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। এর মধ্যে রয়েছে তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা, আওয়ামী লীগের বিচার সম্পন্ন করা, জুলাই সংস্কার বাস্তবায়ন, ঢাকায় আধুনিক ও জনবান্ধব গণপরিবহন চালু করা এবং বাজারে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
তিনি অভিযোগ করেন, বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও প্রভাবশালী মহলের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। এসব অভিযোগের তদন্ত এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
সমাবেশে তিনি আরও হুঁশিয়ারি দেন, দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও বড় করা হবে এবং গুলশানে কথিত সিন্ডিকেটের কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার কর্মসূচি নেওয়া হতে পারে। উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি আন্দোলন জোরদারের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।
সব মিলিয়ে, শাহবাগের সমাবেশে এনসিপি রাজধানীর নাগরিক দুর্ভোগকে কেন্দ্র করে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর বার্তা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত কর্মসূচি কতটা বিস্তৃত হয় এবং উত্থাপিত দাবিগুলোর বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়। নাগরিক সেবা, বাজার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানের মতো ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে রাজনৈতিক অসন্তোষ আরও বাড়তে পারে।

0 Comments