ডেস্ক রিপোর্ট
জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্যে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমঝোতার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। একই সঙ্গে দলটির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-খুলনা লংমার্চে গোপালগঞ্জে পথসভা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েও কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, প্রকাশ্যে ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলেও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা গোপনে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঝিনাইদহে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব অভিযোগ করেন রাশেদ খান। পরে শনিবার (৩১ অক্টোবর) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া পৃথক পোস্টে গোপালগঞ্জে পথসভা না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আবারও জামায়াতের সমালোচনা করেন তিনি।
রাশেদ খানের এসব বক্তব্যকে কেন্দ্র করে জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, বিরোধী দলের অবস্থান এবং মাঠপর্যায়ের কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগের অভিযোগ
রাশেদ খানের অভিযোগ, ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনৈতিক লক্ষ্য সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী এখন থেকেই ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমঝোতার চেষ্টা করছে। তাঁর দাবি, অতীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারতের সঙ্গে যে ধরনের রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছিল, জামায়াতও এখন একই পথে হাঁটছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ঝিনাইদহ পুরাতন ডিসি কোর্ট জামে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে স্থানীয়দের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন রাশেদ খান। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করছেন বলে তাঁর কাছে তথ্য রয়েছে।
তিনি বিশেষভাবে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের বৈঠকের অভিযোগও উত্থাপন করেন।
রাশেদ খানের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের তথ্য শুধু তাঁর কাছেই নয়, সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা এবং কয়েকজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাছেও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে রাশেদ খান বলেন, দলটি যদি এ ধরনের বৈঠকের অভিযোগ অস্বীকার করে, তাহলে তাঁর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারে।
তবে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জামায়াত নেতাদের কথিত বৈঠকের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো প্রমাণ বা জামায়াতের আনুষ্ঠানিক জবাব এই প্রতিবেদনের তথ্যভিত্তিতে পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি রাশেদ খানের রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
ভারতবিরোধী বক্তব্য ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন
জামায়াতের ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে কথিত গোপন যোগাযোগের অভিযোগকে সাংঘর্ষিক হিসেবে তুলে ধরেছেন রাশেদ খান।
তিনি বলেন, প্রকাশ্যে ভারতের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়া এবং অন্যদিকে দেশটির গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করার অভিযোগ একই রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাঁর বক্তব্যের মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কোনো রাজনৈতিক দল যদি জাতীয় স্বার্থ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার দাবি করে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান কতটা স্বচ্ছ ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত?
এখানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত-সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি বণ্টন, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে কোনো রাজনৈতিক দলের ভারতবিষয়ক অবস্থান শুধু নির্বাচনী বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্ষমতায় গেলে সেই অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ কী হবে, সেটিও জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবে রাজনৈতিক যোগাযোগ বা কূটনৈতিক আলোচনা নিজেই অপরাধ কিংবা আধিপত্য মেনে নেওয়ার প্রমাণ নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বৈঠকের উদ্দেশ্য, অংশগ্রহণকারী, সময় ও প্রামাণ্য তথ্য প্রয়োজন।
গোপালগঞ্জে পথসভা না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষোভ
রাশেদ খানের বক্তব্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশ জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ঢাকা-খুলনা লংমার্চকে ঘিরে।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু হওয়া লংমার্চ পদ্মা সেতু হয়ে গোপালগঞ্জ অতিক্রম করে বাগেরহাট, খুলনা, যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হওয়ার কথা।
তবে এই দীর্ঘ যাত্রাপথে গোপালগঞ্জ জেলায় কোনো পথসভা বা জনসমাবেশ না রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ১১ দলীয় জোট।
২৯ অক্টোবর রাতে এক ভিডিও বার্তায় জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও গোপালগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক রেজাউল করিম বিষয়টি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, লংমার্চের গাড়িবহর গোপালগঞ্জ জেলার মহাসড়ক ব্যবহার করলেও সেখানে কোনো পূর্বনির্ধারিত পথসভা বা অন্য কর্মসূচি থাকবে না।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লংমার্চকে কেন্দ্র করে কিছু মহল বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। এ বিষয়ে গোপালগঞ্জবাসীকে গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াতের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই প্রশ্ন তোলেন রাশেদ খান।
‘গোপালগঞ্জে পথসভা করে নৈতিকতার পরীক্ষা দিন’
শুক্রবার ঝিনাইদহে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাশেদ খান বলেন, ঢাকা থেকে লংমার্চ নিয়ে গোপালগঞ্জ হয়ে খুলনায় প্রবেশ করবে জামায়াত। এরপর যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়ায় কর্মসূচি শেষ করবে। অথচ গোপালগঞ্জে কোনো পথসভা করবে না বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন।
তাঁর অভিযোগ, আওয়ামী লীগের ভয়ে জামায়াত গোপালগঞ্জে পথসভা করতে চাইছে না। এই অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে দলটির নেতাদের সেখানে পথসভা আয়োজনের আহ্বান জানান তিনি।
রাশেদ খানের ভাষায়, গোপালগঞ্জে একটি পথসভা আয়োজনের মাধ্যমে জামায়াত নিজেদের নৈতিকতার পরীক্ষা দিতে পারে।
শনিবার নিজের ফেসবুক পোস্টেও তিনি একই প্রসঙ্গ তুলে ধরে জামায়াতের রাজনৈতিক সাহসিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, দলটির নেতারা প্রায়ই বলেন, তাঁরা এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করেন না। কিন্তু গোপালগঞ্জে পথসভা না করার সিদ্ধান্ত সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ প্রসঙ্গে তিনি সাদিক কায়েমদের কথিত গণভবন দখলের পরিকল্পনার প্রসঙ্গ টেনে কটাক্ষ করেন। তাঁর প্রশ্ন, যারা গণভবন দখলের নকশা প্রস্তুত করার কথা বলেছিল বলে দাবি করা হয়, তারা কেন গোপালগঞ্জ অভিমুখে লংমার্চ নিয়ে যাওয়ার মতো সাহস দেখাতে পারছে না?
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট কোনো ধরনের রাজনৈতিক ঝামেলা বা ঝুঁকিতে জড়াতে চায় না। গোপালগঞ্জে পথসভা আয়োজনকে উসকানি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে—এমন আশঙ্কার কারণেই দলটি সেখানে কর্মসূচি রাখেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
লংমার্চের পেছনে কী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য?
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের এই লংমার্চ কেবল একটি সড়কপথের রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়; এর সঙ্গে একাধিক জাতীয় ও রাজনৈতিক দাবি যুক্ত রয়েছে।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, জ্বালানি সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং চাঁদাবাজি বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে এই লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় ঢাকা থেকে খুলনা ও ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখে পৃথক কর্মসূচির কথা থাকলেও দুর্গাপূজার কারণে সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়। পরবর্তী সিদ্ধান্তে ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-যশোর-কুষ্টিয়া অভিমুখী লংমার্চের দিন নির্ধারণ করা হয়।
কর্মসূচির রুটে বিভিন্ন স্থানে পথসভা রাখার পরিকল্পনা থাকলেও গোপালগঞ্জকে এ তালিকার বাইরে রাখা হয়। গোপালগঞ্জ অতিক্রম করে বাগেরহাটের ফকিরহাটে পথসভা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এরপর খুলনা, যশোর ও ঝিনাইদহে কর্মসূচি শেষে কুষ্টিয়ায় সমাপনী সমাবেশ আয়োজনের কথা জানানো হয়।
এই রুট নির্বাচন ও গোপালগঞ্জে পথসভা না রাখার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচন নিয়েও জামায়াতের সমালোচনা
জামায়াতের রাজনৈতিক প্রচারণা নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনের প্রসঙ্গও সামনে আনেন রাশেদ খান।
তিনি দাবি করেন, জামায়াতের ‘জান্নাতের টিকিট’ সংক্রান্ত প্রচারণা নিয়ে সাধারণ মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি সচেতন। তাঁর মতে, ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনের ফলাফল দলটির প্রচারণা সম্পর্কে ভোটারদের মনোভাবের একটি ইঙ্গিত দিয়েছে।
রাশেদ খানের ভাষায়, ওই এলাকার মানুষ জামায়াতের বিভ্রান্তিকর প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে কোনো একটি নির্বাচনের ফলাফল দিয়ে পুরো দেশের ভোটারদের মনোভাব নির্ধারণ করা যায় না। নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে ভোটের ব্যবধান, ভোটার উপস্থিতি, প্রার্থী, স্থানীয় ইস্যু এবং অন্যান্য রাজনৈতিক বাস্তবতাও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সামনে কোন দিকে এগোবে রাজনৈতিক বিতর্ক?
গোপালগঞ্জে পথসভা না করার সিদ্ধান্ত এবং জামায়াতের ভারত-যোগাযোগ নিয়ে রাশেদ খানের অভিযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
একদিকে জামায়াতকে তাদের ভারতনীতি ও গোপালগঞ্জে কর্মসূচি না রাখার কারণ ব্যাখ্যা করার রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে। অন্যদিকে রাশেদ খানের উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা নিয়েও প্রমাণভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পরিবর্তে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর পরিষ্কার উত্তর জনগণের কাছে পৌঁছানো জরুরি।
বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, গোপন রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দেশের প্রতিটি জেলায় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অধিকার—এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক শক্তির প্রকৃত পরিচয় শুধু বক্তব্যের কঠোরতায় নয়; বরং স্বচ্ছতা, সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনসম্পৃক্ততা এবং গণতান্ত্রিক দায়িত্বশীলতার মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়।

0 Comments