Header Ads Widget

Responsive Advertisement

ইরানে হামলায় ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহারের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র


আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সামরিক হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী অ-পারমাণবিক বোমা ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনার সঙ্গে পরিচিত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সিএনএন এ তথ্য প্রকাশ করেছে। পরিকল্পনায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত এ খবর অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশ দিলে এই বোমা ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে। তবে বোমাটি ব্যবহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যেও এর কার্যকারিতা ও কৌশলগত ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হলে এর প্রভাব সামরিক ক্ষেত্র ছাড়িয়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

কী এই ‘মাদার অব অল বোম্বস’?

‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামে পরিচিত অস্ত্রটির আনুষ্ঠানিক নাম GBU-43/B Massive Ordnance Air Blast (MOAB)। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২১ হাজার ৬০০ পাউন্ড ওজনের এই বোমা আকাশ থেকে নিক্ষেপ করা হয় এবং বিস্ফোরণের মাধ্যমে বিস্তৃত এলাকায় ব্যাপক ধ্বংস ঘটাতে পারে।

বোমাটি মূলত বড় এলাকা ও নির্দিষ্ট ধরনের স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য তৈরি। তবে এর বিশাল ধ্বংসক্ষমতা থাকলেই মাটির অনেক গভীরে সুরক্ষিত কোনো স্থাপনা ধ্বংস করার নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। গভীর ভূগর্ভস্থ স্থাপনার ক্ষেত্রে বোমাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এই পার্থক্যটি ইরানের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কিছু পারমাণবিক স্থাপনা ভূগর্ভে বা শক্তিশালী সুরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে অবস্থিত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে MOAB ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও এটি দিয়ে সব ধরনের সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংস করা সম্ভব হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

ইরানের কোন স্থাপনাগুলো সম্ভাব্য লক্ষ্য?

সিএনএনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও পারমাণবিক স্থাপনাকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কোন স্থাপনায় হামলা চালানো হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত ও প্রকাশ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।

পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল। এ ধরনের হামলার ফলাফল নির্ভর করে স্থাপনার অবস্থান, সুরক্ষাব্যবস্থা, ব্যবহৃত অস্ত্র, হামলার মাত্রা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতিক্রিয়ার ওপর।

অন্যদিকে, জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত হানলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ, শিল্পকারখানার কার্যক্রম এবং পরিবহনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অবকাঠামোর ক্ষতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এসব সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে আলোচনা করা হলেও যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন তথ্য নিশ্চিত নয়।

এর আগে কোথায় ব্যবহার করা হয়েছিল বোমাটি?

যুক্তরাষ্ট্র ২০১৭ সালের এপ্রিলে আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের খোরাসান শাখার (আইএস-কে) বিরুদ্ধে অভিযানে প্রথমবারের মতো MOAB ব্যবহার করে। আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশের একটি সুড়ঙ্গ ও গুহা-সংলগ্ন এলাকায় বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

সেই অভিযানে বোমাটির ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিশাল বিস্ফোরণক্ষমতার কারণে অস্ত্রটি সামরিক শক্তির প্রদর্শন হিসেবেও আলোচিত হয়েছে। তবে আফগানিস্তানে এর ব্যবহার আর ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক স্থাপনায় এর ব্যবহার এক ধরনের সামরিক পরিস্থিতি নয়। লক্ষ্যবস্তুর গঠন, গভীরতা, প্রতিরক্ষা এবং সামগ্রিক অভিযানের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।

ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন কেন?

সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, MOAB ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বোমাটির বড় বিস্ফোরণক্ষমতা বিস্তৃত এলাকায় ক্ষতি করতে পারে। কিন্তু কোনো দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি থামানো, ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করা কিংবা সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে কমিয়ে দেওয়ার মতো লক্ষ্য অর্জন শুধু একটি শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে না।

এ ছাড়া সামরিক হামলার ফলাফল কেবল লক্ষ্যবস্তুর ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না। প্রতিপক্ষের পাল্টা প্রতিক্রিয়া, সংঘাতের বিস্তার, বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

ইরানকে ঘিরে সংঘাত বাড়লে তার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই জ্বালানি উৎপাদন, পরিবহনপথ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম, পরিবহন ও বিমা ব্যয় এবং সরবরাহের স্থিতিশীলতা প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বিশেষ চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

তবে সম্ভাব্য হামলার খবরের ভিত্তিতেই জ্বালানির দাম কতটা বাড়বে বা সরবরাহ কতটা ব্যাহত হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে সংঘাতের মাত্রা, আক্রান্ত স্থাপনা, সরবরাহপথের অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর।

সব মিলিয়ে, ইরানে সম্ভাব্য হামলায় ‘মাদার অব অল বোম্বস’ ব্যবহারের আলোচনা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে পরিকল্পনা, সিদ্ধান্ত ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্র চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় কি না, ইরান কী প্রতিক্রিয়া জানায় এবং কূটনৈতিকভাবে উত্তেজনা কমানোর কোনো পথ তৈরি হয় কি না।

Post a Comment

0 Comments