ঢাকা | ডেস্ক রিপোর্ট
বিদেশে পাচার করা বাংলাদেশের অর্থ ও সম্পদ দ্রুত শনাক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত কমিটি। অগ্রাধিকার পাওয়া মামলাগুলোর আসামিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া এবং তাঁদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া কিংবা বিদেশে থাকা সম্পদ অন্যত্র সরিয়ে ফেলার সুযোগ বন্ধ করতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির প্রথম বৈঠকে বিদেশে পাচার হওয়া বাংলাদেশের অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও অংশ নেন।
বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্তে জোর
বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংক তাদের আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় আইনি ও অন্যান্য কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশে থাকা পাচার করা সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, বাণিজ্যিক স্বার্থ, বিদেশি বিনিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক সম্পদের বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি সেগুলো শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা চলছে।
তদন্তের ক্ষেত্রে শুধু অর্থের অবস্থান শনাক্ত করাই নয়, অর্থের মূল উৎস, পাচারের পদ্ধতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক যোগসূত্র এবং অবৈধ সম্পদের সঙ্গে অপরাধের সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কোন কোন সম্পদের তথ্য খোঁজা হচ্ছে?
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। এর মধ্যে রয়েছে—
বিদেশে থাকা জমি ও বাড়ি
ফ্ল্যাট ও প্লট
ব্যাংক হিসাব
কোম্পানির শেয়ার
বিও হিসাব
ব্যবসায়িক স্বার্থ
ট্রাস্ট
বিদেশি বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ তহবিল
এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের উৎস এবং বাংলাদেশ থেকে অর্থ স্থানান্তরের সঙ্গে যোগসূত্র খুঁজে বের করার কাজ চলছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। এ কাজে একটি যৌথ তদন্ত দল (Joint Investigation Team) বিভিন্ন পাচার ও অবৈধ সম্পদ স্থানান্তরসংক্রান্ত মামলার তদন্ত করছে।
কেন ইন্টারপোলের রেড নোটিশের কথা উঠছে?
অর্থ পাচারের মামলায় অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করলে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা জটিল হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা সম্পদ দ্রুত অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এই পরিস্থিতি বিবেচনায় অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি অগ্রাধিকার পাওয়া মামলাগুলোতে দ্রুত ইন্টারপোলের রেড নোটিশের জন্য অনুরোধ করার সুপারিশ করেছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রেড নোটিশ কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়; সংশ্লিষ্ট দেশ তাদের নিজস্ব আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়। ফলে সংসদীয় কমিটির সুপারিশের পরও সংশ্লিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞারও তাগিদ
কমিটি মনে করে, অর্থ পাচারসংক্রান্ত মামলার অগ্রগতি চলাকালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়া কিংবা বিদেশে থাকা সম্পদ স্থানান্তরের সুযোগ সীমিত করা প্রয়োজন।
এ কারণে অগ্রাধিকার পাওয়া মামলাগুলোর ক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়েও তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিয়ে পাচার করা সম্পদ সুরক্ষিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এর আগেও সম্পদ উদ্ধারে একাধিক উদ্যোগ
বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ ফেরত আনতে সরকারের কার্যক্রম নতুন নয়। গত সেপ্টেম্বরে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পাচার হওয়া সম্পদ দক্ষতার সঙ্গে উদ্ধারের লক্ষ্যে একটি বিশেষায়িত সংস্থা গঠনের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের কথা জানানো হয়েছিল। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় ১১টি অগ্রাধিকার মামলা চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এসব মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের নেতৃত্বে যৌথ তদন্ত দল কাজ করছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত ওই ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় দেশে ও বিদেশে আদালতের আদেশে প্রায় ৭৬ হাজার ৯৮৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ জব্দ বা ফ্রিজ করা হয়েছে বলে সংসদে জানানো হয়েছিল।
বিদেশে সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (BFIU) পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, বিদেশে পাচার করা সম্পদ উদ্ধারের কাজ এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। সংশ্লিষ্ট দেশের আদালত ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পদ শনাক্ত, জব্দ এবং দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ চলছে।
BFIU-এর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ পাচার মামলায় অর্থের উৎস অনুসন্ধান, সম্পদের অবস্থান শনাক্তকরণ, জব্দ এবং আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরত আনার কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সম্পদ ফেরত আনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়?
বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনায় শুধু অপরাধ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়। একটি অর্থ বা সম্পদের উৎস থেকে বিদেশে স্থানান্তর, বিভিন্ন হিসাব বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঘুরিয়ে দেওয়া, প্রকৃত মালিকানা গোপন করা এবং শেষ পর্যন্ত সম্পদে রূপান্তরিত করার পুরো আর্থিক পথ শনাক্ত করা প্রয়োজন।
এরপর যে দেশে সম্পদ রয়েছে, সেই দেশের আইন অনুযায়ী সেটি ফ্রিজ, জব্দ কিংবা বাজেয়াপ্ত করার জন্য আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে।
ফলে দেশে তদন্তের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তথ্য বিনিময়, পারস্পরিক আইনি সহায়তা এবং আদালতভিত্তিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

0 Comments