কৃষ্ণসাগরে একটি তুরস্কের মালিকানাধীন বেসামরিক পণ্যবাহী জাহাজে রাশিয়ার ড্রোন হামলায় এক ভারতীয় নাবিক আহত হয়েছেন। হামলায় জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং কয়েকজন হতাহত হন। ঘটনাটি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। নয়াদিল্লি বেসামরিক জাহাজে এ ধরনের হামলাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছে।
ঘটনাটি ঘটে রোমানিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে কৃষ্ণসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায়। হামলার শিকার জাহাজটির নাম এমভি রয়াদ মামাদভ (MV Royad Mammadov)। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজটিতে দুটি রুশ ড্রোন আঘাত হানে। জাহাজটি ইউক্রেন থেকে ভুট্টা নিয়ে ইতালির রাভেনা বন্দরের দিকে যাচ্ছিল।
আহত ভারতীয় নাবিক হাসপাতালে
রোমানিয়ায় অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস জানিয়েছে, হামলার সময় জাহাজটিতে তিনজন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য রোমানিয়ার কনস্টানতা কাউন্টি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিন ভারতীয় নাবিকই নিরাপদ আছেন। রোমানিয়ায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মনোজ মহাপাত্র আহতসহ ভারতীয় নাবিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। চিকিৎসকরা তাদের শারীরিক অবস্থা ভালো বলে জানিয়েছেন।
ভারতীয় মিশন আহত নাবিকের চিকিৎসা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
হামলায় হতাহতের খবর
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, হামলার পর জাহাজটির ক্যাপ্টেন নিহত হয়েছেন। আরও একজনের ভাগ্য সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। মোট ১১ জন ক্রুকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি জানান; উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে একজন আহত ছিলেন।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য রয়েছে। ভারতীয় দূতাবাসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনায় দুই বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে এবং কয়েকজন আহত হয়েছেন। নিহতদের জাতীয়তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
‘বেসামরিক জাহাজে হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’
ঘটনার পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কৃষ্ণসাগর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বেসামরিক জাহাজে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ভারতের অবস্থান হলো, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের সমাধানে সামরিক পথের পরিবর্তে আলোচনা ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, বেসামরিক জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ভারত সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে।
কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ক্রমেই বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। এই অঞ্চলের সমুদ্রপথ ইউক্রেনের শস্য ও অন্যান্য পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি বেসামরিক জাহাজে হামলা ও নাবিক হতাহতের ঘটনায় ভারত তার নাগরিক নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আরও সক্রিয় হয়েছে। জয়শঙ্কর জানিয়েছেন, জুলাইয়ে বেসামরিক জাহাজে হামলায় ভারতীয় নাবিক নিহত ও আহত হওয়ার পর নয়াদিল্লি রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষের সঙ্গেই বিষয়টি সরাসরি তুলেছে।
ভারতের আলোচনায় এখন শুধু নৌপথের নিরাপত্তা নয়, শস্য পরিবহন, জ্বালানি এবং সম্ভাব্য ‘নন-অ্যাটাক’ ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এসব উদ্যোগ থেকে যুদ্ধের অবসান বা তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতা হবে—এমন নিশ্চয়তা ভারতও দিচ্ছে না।
ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে চলমান সংঘাতের ক্ষেত্রে ভারত ঐতিহ্যগতভাবে দুই পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রেখে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষ্ণসাগরে বেসামরিক জাহাজে হামলার ঘটনা নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নৌপথের নিরাপত্তা থেকে শুরু করে শস্য ও জ্বালানি পরিবহন—বিভিন্ন বিষয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। নয়াদিল্লির অবস্থান, সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনাই প্রয়োজন।
কৃষ্ণসাগরে সর্বশেষ হামলায় ভারতীয় নাবিক আহত হওয়ার ঘটনায় তাই শুধু একটি বাণিজ্যিক জাহাজ আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ই সামনে আসেনি; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের প্রশ্নও।

0 Comments