ঢাকা | অর্থনীতি ডেস্ক
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে আবারও ইতিবাচক চিত্র দেখা যাচ্ছে। সদ্য শেষ হওয়া সেপ্টেম্বর মাসে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় ২৭৪ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন। এর ফলে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৯ দিনেই দেশে ২৬৪ কোটি ১০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। ২৯ সেপ্টেম্বর একদিনেই প্রবাসীরা প্রায় ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার পাঠান। এরপর মাসের শেষ দিনের প্রবাহ যোগ হওয়ায় সেপ্টেম্বরের মোট রেমিট্যান্স প্রায় ২৭৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারে দাঁড়ায়।
এ প্রবাহ শুধু একটি মাসের হিসাবেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিকতা দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার তারল্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে।
প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্সে বড় প্রবৃদ্ধি
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত দেশে প্রায় ৮৫৭ কোটি ডলারের কাছাকাছি রেমিট্যান্স এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিসাবে জুলাই থেকে ওই সময় পর্যন্ত রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ৮৪৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। একই সময়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসেছিল ৭৪৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের শেষ দিনের প্রবাহ যুক্ত হওয়ার আগেই তিন মাসের তুলনামূলক প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ।
এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের রেমিট্যান্স প্রবাহও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি ছিল। সেপ্টেম্বরের শেষভাগেও বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর ধারা অব্যাহত থাকায় প্রথম প্রান্তিকের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
সেপ্টেম্বরেও ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে, তবে প্রবাহে স্থিতিশীলতা
সেপ্টেম্বরে ২৭৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এলেও মাসিক প্রবাহ এখনো ৩০০ কোটি ডলারের নিচে। অর্থাৎ প্রবাসী আয় আগের কয়েক মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় কিছুটা কম থাকলেও প্রবাহ একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েনি।
আগস্টে দেশে প্রায় ২৯৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল। ওই মাসে আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ২২ শতাংশের বেশি। তবে আগস্টসহ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রেমিট্যান্স ধারাবাহিকভাবে ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—একটি নির্দিষ্ট মাসের রেমিট্যান্স দিয়ে সামগ্রিক প্রবণতা বিচার করার চেয়ে কয়েক মাসের ধারাবাহিকতা দেখা বেশি কার্যকর। সেই হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবাহের চিত্র ইতিবাচক।
বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা
রেমিট্যান্সের প্রবাহ বৃদ্ধির সঙ্গে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠালে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে এবং আনুষ্ঠানিক বৈদেশিক লেনদেনের হিসাবেও তা প্রতিফলিত হয়।
চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রবাহ তুলনামূলক শক্তিশালী রয়েছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই ১৪২ কোটি ৭০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ কিছুটা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রভাব কোথায়
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের ভূমিকা বহুমাত্রিক। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ সরাসরি পরিবারগুলোর ভোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, আবাসন ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়ার ফলে আমদানি অর্থায়ন ও বৈদেশিক লেনদেন পরিচালনায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং রপ্তানি আয়ের ওঠানামার মধ্যে রেমিট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ বহিঃখাতীয় উৎস হিসেবে কাজ করে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েই শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে বাংলাদেশের চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত ছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিজার্ভের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
রেমিট্যান্স সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের একমাত্র উৎস নয়; রপ্তানি আয়, বৈদেশিক ঋণ, বিনিয়োগ ও অন্যান্য বৈদেশিক লেনদেনও রিজার্ভের ওপর প্রভাব ফেলে। তবে ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়মিত রেমিট্যান্স প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফলে রেমিট্যান্সের প্রবাহ শক্তিশালী থাকলে ডলারের বাজারে তারল্য ব্যবস্থাপনা, আমদানি বিল পরিশোধ এবং বহিঃখাতের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
আগের অর্থবছরের রেকর্ডের পর নতুন প্রত্যাশা
২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বাংলাদেশ রেমিট্যান্সে বড় প্রবৃদ্ধি দেখেছে। ওই অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি।
এই রেকর্ডের পর নতুন অর্থবছরের শুরুতে রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক প্রবাহ ধরে রাখা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রথম তিন মাসে দ্বি-অঙ্কের প্রবৃদ্ধি সেই ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

0 Comments