ড্রোন হামলার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি মোকাবিলায় পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের পুলিশ নিয়েছে বেশ অপ্রচলিত এক প্রতিরোধব্যবস্থা—পুলিশ চৌকির ওপর মাছ ধরার জাল টাঙিয়ে দেওয়া।
আফগানিস্তান সীমান্তসংলগ্ন হাঙ্গু জেলার বিভিন্ন পুলিশ চেকপোস্ট ও ফাঁড়িতে কয়েক মিটার উঁচুতে জাল টেনে তৈরি করা হয়েছে এক ধরনের আকাশঢাকা প্রতিরক্ষা স্তর। স্থানীয় পুলিশের দাবি, বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন জালে আটকে যেতে পারে অথবা জালের ওপরে বিস্ফোরণ ঘটলে নিচে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর ছড়িয়ে পড়া ধ্বংসাবশেষের আঘাত কিছুটা কমতে পারে।
তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবস্থা সর্বোচ্চ একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা স্তর হতে পারে; আধুনিক ড্রোন হামলা ঠেকানোর পূর্ণাঙ্গ সমাধান হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা যাবে না। জালের কার্যকারিতা, ড্রোনের ধরন, বিস্ফোরকের ওজন ও আক্রমণের কৌশলের ওপর এর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করবে।
হামলার পর বদলেছে নিরাপত্তা কৌশল
প্রথম আলো ও আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল হাঙ্গুর সারকি পিয়ালা পুলিশ চৌকিতে বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোন হামলা চালানো হয়। হামলার দায় স্বীকার করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি।
ড্রোন হামলার পর হামলাকারীরা চৌকিটি ঘিরে গুলি চালায়। প্রায় সাত ঘণ্টার সংঘর্ষে একটি সাঁজোয়া গাড়ির চালক নিহত এবং একজন পুলিশ সদস্য আহত হন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই ঘটনার পর পুলিশ বুঝতে পারে, প্রচলিত বাংকার বা দেয়ালের পাশাপাশি ওপরের দিক থেকেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেখান থেকেই মাছ ধরার জাল ব্যবহারের ধারণাটি সামনে আসে।
কীভাবে কাজ করবে এই জাল?
হাঙ্গু পুলিশের কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চৌকির ভবন ও সীমানাপ্রাচীরের ওপর কয়েক মিটার উচ্চতায় জাল টাঙানো হয়েছে। ফলে নিচে অবস্থানরত পুলিশ সদস্যদের মাথার ওপর একটি অতিরিক্ত স্তর তৈরি হয়েছে।
কোনো ড্রোন সরাসরি নিচে নামতে চাইলে সেটি জালে আটকে যেতে পারে। আবার ড্রোনটি জালের ওপরে বিস্ফোরিত হলেও বিস্ফোরণের কিছু অংশের ধ্বংসাবশেষ সরাসরি নিচে না পড়ে অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন ধারণা করছে পুলিশ।
তবে এটি কোনো নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নয়। আল-জাজিরার সঙ্গে কথা বলা নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন, জালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভুল আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে।
একেকটি চৌকিতে খরচ প্রায় ৪ লাখ পাকিস্তানি রুপি
হাঙ্গু জেলা পুলিশের কর্মকর্তা তারিক হাবিবের তথ্য অনুযায়ী, একটি সাধারণ পুলিশ চৌকি এ ধরনের জাল দিয়ে ঢাকতে প্রায় ৪ লাখ পাকিস্তানি রুপি, অর্থাৎ প্রায় ১ হাজার ৪৩৫ মার্কিন ডলার খরচ হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ আরও কয়েকটি পুলিশ স্টেশনে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কোহাট, কারাক, বান্নু, লাক্কি মারওয়াত ও ডেরা ইসমাইল খানসহ আরও কয়েকটি এলাকায় এমন জাল বসানো হয়েছে। কিছু সামরিক চৌকিতেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
হাঙ্গুতে একের পর এক হামলা
মাছ ধরার জাল ব্যবহারের পেছনে মূল কারণ হলো ওই অঞ্চলে ড্রোন ও সশস্ত্র হামলার ঝুঁকি বৃদ্ধি।
২৯ জুলাই হাঙ্গুর একটি পুলিশ ফাঁড়িতে বিস্ফোরকবোঝাই কোয়াডকপ্টার দিয়ে হামলার পর স্থলপথে হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১১ পুলিশ সদস্য নিহত ও ২৮ জন আহত হন বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ১৫ হামলাকারীও নিহত হয় বলে স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে। হামলার দায় টিটিপি স্বীকার করেছিল।
এরপর ২০ সেপ্টেম্বর হাঙ্গুতে আরেক সংঘর্ষে ছয় সেনা ও আট হামলাকারী নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। একই সময়ের আশপাশে খাইবার পাখতুনখাওয়ার কোহাটেও সমন্বিত হামলায় ২৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য এসেছে।
পুলিশের হিসাবে, চলতি বছর হাঙ্গুতে অন্তত ১৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
জাল কি সত্যিই ড্রোন ঠেকাতে পারবে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
হাঙ্গু পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাল স্থাপনের পর সারকি পিয়ালা ও কাছের বালিয়ামেনা চৌকিতে আর কোনো ড্রোন হামলা হয়নি। পুলিশের একজন কর্মকর্তা এমনও ধারণা করেছেন যে ব্যবস্থা সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে।
কিন্তু এই শতাংশ এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব হামলায় জালের কার্যকারিতা নির্ভর করবে ড্রোনের গতি, উচ্চতা, আকার, বিস্ফোরকের ধরন এবং জালের কাঠামোর ওপর। তাই বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, কোহাটে জাল ব্যবস্থার একটি পরীক্ষাও চালানো হয়েছিল। তবে এই ধরনের ব্যবস্থা কোনোভাবেই সম্পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি কোথায়?
বিশ্লেষণ: পাকিস্তানের এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের জন্য সরাসরি সামরিক মডেল হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এটি বাংলাদেশের জন্য কম খরচে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় উদ্ভাবনের একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে।
বাংলাদেশেও বেসামরিক ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে—কৃষি, ভিডিওগ্রাফি, পর্যবেক্ষণ, শিল্প ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কাজে। একই সঙ্গে বিমানবন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও সীমান্তবর্তী এলাকায় অননুমোদিত ড্রোন প্রবেশ ভবিষ্যতে নিরাপত্তার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ঝুঁকিভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা—যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রোন শনাক্তকরণ, রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি পর্যবেক্ষণ, ক্যামেরা, নিরাপদ জোন এবং প্রশিক্ষিত অপারেটর ব্যবহার করা হবে।
মাছ ধরার জালের মতো স্বল্পমূল্যের শারীরিক প্রতিবন্ধক কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা স্তর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; কিন্তু এটিকে মূল অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা বানানো যুক্তিযুক্ত নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—কম খরচে স্থানীয় উদ্ভাবন
পাকিস্তানের ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—নিরাপত্তা প্রযুক্তি মানেই সবসময় অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিদেশি প্রযুক্তি নয়।
বাংলাদেশের প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও স্টার্টআপগুলোকে যুক্ত করে কম খরচের ড্রোন শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করা যেতে পারে।
বিশেষ করে—
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ড্রোন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা;
স্থানীয়ভাবে তৈরি সেন্সর ও ক্যামেরা;
AI-ভিত্তিক ড্রোন শনাক্তকরণ;
রেডিও-ফ্রিকোয়েন্সি পর্যবেক্ষণ;
নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য প্রশিক্ষণ;
বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প–সরকার যৌথ গবেষণা;
জরুরি পরিস্থিতির জন্য দ্রুত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা
গড়ে তোলা বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে।
সীমান্ত নিরাপত্তায় বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বার্তা
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ড্রোন হামলার সঙ্গে সীমান্তবর্তী সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্কেও উত্তেজনা রয়েছে। পাকিস্তান টিটিপির বিরুদ্ধে আফগান ভূখণ্ড ব্যবহারের অভিযোগ করে আসছে, আর কাবুল এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
বাংলাদেশের জন্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—সীমান্ত নিরাপত্তাকে শুধু স্থলভিত্তিক নজরদারিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যতের ড্রোন, সেন্সর ও প্রযুক্তিনির্ভর হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতাও ধীরে ধীরে বাড়ানো।
শেষ কথা
পাকিস্তানের মাছ ধরার জাল হয়তো ড্রোন যুদ্ধের কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। কিন্তু এটি দেখিয়ে দিয়েছে, নতুন ধরনের হুমকির মুখে সীমিত সম্পদ ব্যবহার করেও দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশের জন্য মূল শিক্ষা হওয়া উচিত—অন্ধভাবে কোনো বিদেশি পদ্ধতি অনুসরণ নয়; বরং দেশের নিজস্ব প্রয়োজন, ভূগোল ও নিরাপত্তা বাস্তবতা বিবেচনায় কম খরচের স্থানীয় উদ্ভাবন + আধুনিক প্রযুক্তি + দক্ষ জনবল—এই তিনটির সমন্বয়ে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা।
এতে একদিকে নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তি শিল্প ও প্রতিরক্ষা-উদ্ভাবনের ক্ষেত্রও শক্তিশালী হতে পারে।

0 Comments