Header Ads Widget

Responsive Advertisement

রাবিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা: সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে প্রশ্ন, হল প্রাধ্যক্ষ অব্যাহতি


ক্যাম্পাস ডেস্ক

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে। হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ ফুটেজ পাওয়া যাচ্ছে না—সাংবাদিকদের এমন অভিযোগের পর শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে হামলার ঘটনা তদন্তে কমিটিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটে রোববার (৪ অক্টোবর) রাতে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে। প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর একদল হামলা চালায়। এতে চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ জামান কোরবান, আগামীর সময়ের জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান মৃদুল এবং সমকালের মাইনুল ইসলাম রাজু রয়েছেন। পরে আহত সাংবাদিকদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

কী ঘটেছিল রাবি ক্যাম্পাসে?

প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালন ও ভিডিও ধারণের সময় হামলার শিকার হন। আহত সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, হামলায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে শাখার সহসভাপতি আহসান হাবিব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলমের নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

তবে হামলার কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পক্ষগুলোর বক্তব্য এক নয়। অভিযুক্তদের একজনের দাবি, হলে এক সাবেক ছাত্রলীগ নেতাকে ধরতে যাওয়ার সময় শিবির-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন সাংবাদিক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করতে আসেন এবং তারা তা প্রতিরোধ করেন। অন্যদিকে সাংবাদিকদের বক্তব্য, তারা পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং তাদের ওপরই হামলা চালানো হয়েছে। ফলে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে কেন এত প্রশ্ন?

হামলার পর শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহের চেষ্টা করা হয় বলে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ফুটেজ সরবরাহে অস্বীকৃতি জানান হল প্রাধ্যক্ষ এবং পরে হার্ডডিস্ক পরীক্ষা করে হামলার সময়ের ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকদের দাবি, হামলাকারীদের আড়াল করতেই ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে।

তবে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান। তার বক্তব্য, হলের সংস্কারকাজ চলায় ওই সময় সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল এবং তাই কোনো ফুটেজ ছিল না; ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ মিথ্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রশাসনও বলেছেন, তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হবে।

অর্থাৎ, ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছিল, নাকি ক্যামেরা/সংযোগ আগে থেকেই অকার্যকর ছিল—এটি এখনো তদন্তসাপেক্ষ বিষয়। এ জায়গায় অনুমানকে সত্য হিসেবে না ধরে প্রযুক্তিগতভাবে ডিভিআর/এনভিআর, স্টোরেজ লগ, ক্যামেরার সংযোগ এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের ব্যাকআপ যাচাই করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশাসনের পদক্ষেপ

সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে অব্যাহতি দিয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত কমিটিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বা তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপাচার্য জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে/মামলার উদ্যোগ নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। কিন্তু হামলার ভিডিওতে কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে—এমন তথ্য সামনে আসার পর মামলায় নির্দিষ্ট নাম না থাকা নিয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।

ছাত্রদলের সাংগঠনিক ব্যবস্থা

ঘটনার পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদও তদন্ত কমিটি গঠন করে। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার তিন নেতাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং আরও কয়েকজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সাতজন ছাত্রদল নেতা-কর্মীকে শনাক্ত করা হয়েছে বলেও একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আইনগতভাবে প্রমাণিত হয়েছে—তা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়; রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক অভিযোগকে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।

সাংবাদিকদের আন্দোলন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বয়কট

হামলার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সংগঠনগুলো বিচার ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবিতে আন্দোলনে নামে। পরে তিনটি সাংবাদিক সংগঠন জানায়, হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমের সংবাদ সংগ্রহ স্থগিত রাখা হবে।

তাদের অন্যতম দাবি হলো—তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রকৃত হামলাকারীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া।

বাংলাদেশের স্বার্থে বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্লেষণ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি কেবল একটি ক্যাম্পাস সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে এর বৃহত্তর গুরুত্ব আড়ালে পড়ে যেতে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনভাবে তথ্য সংগ্রহের অধিকার কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অংশ।

প্রথমত, সাংবাদিকের ওপর হামলা মানে তথ্যপ্রবাহের ওপর চাপ তৈরি হওয়া। ক্যাম্পাসে সাংবাদিকেরা যদি রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক প্রভাবের কারণে দায়িত্ব পালনে বাধাগ্রস্ত হন, তাহলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, সিসিটিভি ফুটেজের মতো প্রমাণ সংরক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি অপরিহার্য। ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ সত্য হোক বা মিথ্যা—দুই ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ প্রযুক্তিগত তদন্ত প্রয়োজন। কারণ প্রমাণ সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট হলে ভবিষ্যতের যেকোনো ঘটনার তদন্তও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয় তদন্তের বিকল্প হতে পারে না। হামলায় কোনো সংগঠনের সদস্য জড়িত থাকলে সংগঠনগত ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বাংলাদেশের আইনের শাসনের স্বার্থে ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করতে হবে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক সংঘাতের বাইরে একটি নিরাপদ ও মুক্ত জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী কিংবা যেকোনো পক্ষের ওপর সহিংসতা ক্যাম্পাসের শিক্ষার পরিবেশকে দুর্বল করে।

এখন কী হওয়া উচিত?

এই ঘটনায় বাংলাদেশের স্বার্থে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে—

  • হামলার পুরো ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত;

  • সিসিটিভি/ডিজিটাল প্রমাণের ফরেনসিক পরীক্ষা;

  • প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ;

  • ভিডিও ফুটেজে শনাক্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে আইন অনুযায়ী তদন্ত;

  • অভিযোগ প্রমাণিত হলে দল-মত নির্বিশেষে আইনগত ব্যবস্থা;

  • সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা;

  • বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা;

  • ভবিষ্যতে কোনো প্রমাণ নষ্ট বা গোপন করার অভিযোগ উঠলে তার জন্য আলাদা জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

শেষ কথা

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘটনার পূর্ণ সত্য উদঘাটনের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রমাণভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত।

কেউ অভিযুক্ত হলেই অপরাধী—এমন সিদ্ধান্ত যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কোনো অভিযোগ উপেক্ষা করাও বাংলাদেশের স্বার্থের পরিপন্থী। সত্য উদঘাটন, সাংবাদিকের নিরাপত্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের জবাবদিহি এবং আইনের শাসন—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত হলেই ঘটনাটির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব।

Post a Comment

0 Comments