আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের বিহার রাজ্যের কাটিহার জেলায় দিনের আলোয় জনবহুল এলাকায় এক আইনজীবীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। নিহত আইনজীবীর নাম আজিমুদ্দিন আনসারি, যিনি ‘গুড্ডু আনসারি’ নামেও পরিচিত ছিলেন। সোমবার (৫ অক্টোবর) সকাল/দুপুরের দিকে কাটিহার শহরের কুমহার টোলি এলাকার প্যাটেল চকের কাছে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ জানিয়েছে, হামলাকারীরা এখনো শনাক্ত বা গ্রেপ্তার হয়নি। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন আলামত পরীক্ষা করে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। কাটিহারের পুলিশ সুপার পরিচয় কুমার বলেছেন, পুলিশ সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে এবং দ্রুত হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
আদালতে যাওয়ার পথে হামলা
পুলিশ ও একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজিমুদ্দিন আনসারি কাটিহার সিভিল কোর্টে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হন। প্যাটেল চকের কাছাকাছি এলাকায় কয়েকজন ব্যক্তি তাকে ঘিরে ফেলে।
প্রাথমিক পুলিশি তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করার পর গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে হামলার সুনির্দিষ্ট সময় ও হামলার পদ্ধতির বর্ণনায় কিছু পার্থক্য রয়েছে। পুলিশের বক্তব্যে ঘটনাটি আনুমানিক সকাল ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে ঘটেছে বলা হয়েছে; অন্য কিছু প্রতিবেদনে আরও আগের সময় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সময়ের ক্ষেত্রে পুলিশের প্রাথমিক তথ্যকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সিসিটিভিতে হামলার দৃশ্য
ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পাশাপাশি আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজও তদন্তকারীরা সংগ্রহ করছেন। ফুটেজে কয়েকজন ব্যক্তিকে আইনজীবীকে ঘিরে ফেলতে এবং হামলার পর ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে দেখা গেছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি—এ বিষয়টি PTI-ও উল্লেখ করেছে। তাই ভিডিওটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করে তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ আশপাশের দোকান ও অন্যান্য স্থাপনায় থাকা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজও পরীক্ষা করছে। এর মাধ্যমে হামলাকারীরা কোথা থেকে এসেছিল, হামলার পর কোন পথে পালিয়েছে এবং ঘটনার আগে তারা নিহত আইনজীবীকে অনুসরণ করেছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুরোনো বিরোধের অভিযোগ
হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে একটি পুরোনো বিরোধের বিষয় সামনে এসেছে। নিহতের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, কয়েক মাস আগে একটি বিরোধকে কেন্দ্র করে আজিমুদ্দিনকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
Times of India-এর প্রতিবেদনে নিহতের স্বজনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তার বোনের সঙ্গে স্থানীয় এক ব্যক্তির পথসংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে থানায় অভিযোগ হয়েছিল। ওই বিরোধের জেরে আদালত চত্বরেও আজিমুদ্দিনকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
তবে পরিবারের অভিযোগ এখনো আদালত বা পুলিশের চূড়ান্ত তদন্তে প্রমাণিত নয়। পুলিশ হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করতে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
পুলিশ বলছে, সব দিকেই তদন্ত
কাটিহারের পুলিশ সুপার পরিচয় কুমার জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সম্ভাব্য অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ, আদালত-সংক্রান্ত বিরোধ বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না—সব সম্ভাবনাই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ঘটনায় একাধিক পুলিশ দল কাজ করছে। তদন্তকারীদের লক্ষ্য শুধু হামলাকারীদের শনাক্ত করা নয়; বরং হত্যার আগে ও পরে তাদের গতিবিধি এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ভূমিকাও নির্ধারণ করা।
আইনজীবী মহলে ক্ষোভ
দিনদুপুরে একজন আইনজীবীকে প্রকাশ্য এলাকায় হত্যা করার ঘটনায় কাটিহারের আইনজীবী সমাজে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। Times of India-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় আইনজীবীরা প্রতিবাদ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। ৬ অক্টোবর তারা ‘পেন-ডাউন’ কর্মসূচি পালন এবং পরদিন কালো ব্যাজ ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো আইনজীবী মামলা পরিচালনা করবেন না বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আইনজীবীদের এই প্রতিক্রিয়া মূলত দুইটি প্রশ্নকে সামনে এনেছে—প্রকাশ্য স্থানে একজন পেশাজীবীর নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত এবং পূর্ববর্তী বিরোধ বা হুমকির তথ্য থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কত দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

0 Comments