আন্তর্জাতিক ডেস্ক | দক্ষিণ এশিয়া
হিমালয়ের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত একটি অঞ্চলকে ঘিরে চীন ও পাকিস্তানের নতুন সীমান্ত সহযোগিতা নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তান ও চীন সম্প্রতি তাদের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও প্রাতিষ্ঠানিক করতে পাকিস্তান–চীন যৌথ সীমান্ত কমিশন কার্যকর করেছে। বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ভারত।
চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে ১৯৬৩ সালের সীমান্ত চুক্তিতে যৌথ সীমান্ত কমিশনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশ সেই কাঠামোকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়। এর আওতায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যৌথ জরিপ, সীমান্ত চিহ্ন বা পিলার সংক্রান্ত বিষয়, আন্তঃসীমান্ত স্থাপনা এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত বিভিন্ন ঘটনা মোকাবিলায় দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ভারতের আপত্তি কোথায়?
ভারতের আপত্তির মূল কারণ সীমান্ত কমিশন নয়, বরং যে ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে চীন-পাকিস্তান সীমান্ত ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে, সেই ভূখণ্ডের মালিকানা নিয়ে দিল্লির দীর্ঘদিনের দাবি।
ভারত ওই অঞ্চলের একটি অংশকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং পাকিস্তান-চীন সীমান্তকে স্বীকৃতি দেয় না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, তথাকথিত যৌথ কমিশনের কোনো আইনি ভিত্তি ভারত স্বীকার করে না।
বিশেষ করে শাকসগাম উপত্যকা নিয়ে বিরোধটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ৫ হাজার ১৮০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই অঞ্চল পাকিস্তান ১৯৬৩ সালে চীনের কাছে হস্তান্তর করেছিল। ভারত ওই চুক্তিকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং অঞ্চলটিকে সাবেক জম্মু ও কাশ্মীরের অংশ বলে দাবি করে।
অন্যদিকে পাকিস্তান ১৯৬৩ সালের চীন-পাকিস্তান সীমান্ত চুক্তিকে বৈধ হিসেবে বিবেচনা করে এবং কাশ্মীরকে একটি বিতর্কিত অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরে। ফলে একই ভূখণ্ডকে ঘিরে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যৌথ কমিশনে কী হবে?
নতুন কাঠামোর মাধ্যমে চীন ও পাকিস্তান সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কিছু বাস্তব বিষয় নিয়ে নিয়মিতভাবে কাজ করতে পারবে। এর মধ্যে রয়েছে—
সীমান্তের যৌথ জরিপ;
সীমান্ত পিলার ও চিহ্ন রক্ষণাবেক্ষণ;
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা;
আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামো সমন্বয়;
সীমান্ত বাণিজ্য ও যোগাযোগ;
সীমান্তে উদ্ভূত বিভিন্ন ঘটনা মোকাবিলা।
অর্থাৎ এটি শুধু মানচিত্র বা সীমারেখা নির্ধারণের বিষয় নয়; সীমান্তকে কেন্দ্র করে দুই দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয়ও এর অংশ হতে পারে।
ভারত-চীন সম্পর্কের সময়েই নতুন সমীকরণ
চীন-পাকিস্তানের এই উদ্যোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত ও চীন তাদের দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। ২০২০ সালের পর হিমালয় সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বড় আকার ধারণ করেছিল।
এই প্রেক্ষাপটে চীন ও পাকিস্তানের সীমান্ত সহযোগিতা ভারতের জন্য আলাদা কৌশলগত গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, পাকিস্তান ও চীন—দুই দেশের সঙ্গেই ভারতের দীর্ঘদিনের ভূখণ্ডগত ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই উদ্যোগকে সরাসরি সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে দেখার চেয়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে ধীরে ধীরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
আঞ্চলিক রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত সহযোগিতা বাড়লে কাশ্মীর ও হিমালয় অঞ্চলকে ঘিরে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরসহ সীমান্তবর্তী যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোর নিরাপত্তা ও পরিচালনাতেও এই সহযোগিতা ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নতুন কমিশন চালু হওয়া মানেই বিতর্কিত ভূখণ্ডের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অবস্থান বদলে গেছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। ভারত ইতোমধ্যে এই উদ্যোগের বৈধতা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে বিষয়টি মূলত তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন ভূখণ্ডগত দাবির মধ্যেই থেকে যাচ্ছে।

0 Comments