Header Ads Widget

Responsive Advertisement

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ কমছে কেন? ডলার, নীতি ও বৈশ্বিক উত্তেজনার প্রভাব


টানা ছয় বছর বিদেশি বিনিয়োগে নিট বহিঃপ্রবাহ; ডলার, মুদ্রার অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাত ও নীতিগত অনিশ্চয়তায় বাড়ছে চাপ

অর্থনীতি ও পুঁজিবাজার ডেস্কঃ

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, শক্তিশালী মার্কিন ডলার, মুদ্রার বিনিময় হার নিয়ে ঝুঁকি, ব্যাংকিং খাতের চাপ এবং দেশীয় বাজারে নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের শেয়ারবাজারে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগের নিট বহিঃপ্রবাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরে এই বহিঃপ্রবাহ ছিল প্রায় ১৩৮ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্য দিয়ে টানা ষষ্ঠ অর্থবছর বিদেশি বিনিয়োগে নিট বহিঃপ্রবাহ দেখা গেল।

কেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পিছিয়ে যাচ্ছেন?

বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। এর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের নীতিগত পরিবর্তন, শেয়ারদরের ফ্লোর প্রাইস, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, স্থানীয় মুদ্রার ওঠানামা, কোম্পানির মুনাফায় চাপ এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ আস্থার ঘাটতি।

বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখন তুলনামূলক বেশি তারল্য, শক্তিশালী আয়, সহজ বাজারে প্রবেশ এবং স্পষ্ট নীতিগত পরিবেশকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এশিয়ার অন্য বাজারে অর্থ ফিরলেও বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন

বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো—এশিয়ার কয়েকটি বড় শেয়ারবাজারে একই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে।

আগস্টে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪.৭২ বিলিয়ন ডলার নিট বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে ভারত একাই পেয়েছে প্রায় ৩.১ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিনিয়োগকারীরা সম্পূর্ণভাবে এশিয়ার বাজার থেকে সরে যাচ্ছেন না; বরং তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক ও পূর্বানুমানযোগ্য বাজার বেছে নিচ্ছেন।

ডলার ও মার্কিন সম্পদের আকর্ষণ

শক্তিশালী মার্কিন ডলারও বাংলাদেশের মতো সীমান্তবর্তী ও উদীয়মান বাজারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদে তুলনামূলক আকর্ষণীয় রিটার্ন এবং মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের উচ্চতর ফলন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের ডলারভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে।

অন্যদিকে স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে শেয়ারের দাম অপরিবর্তিত থাকলেও ডলারের হিসাবে বিনিয়োগের মূল্য কমে যেতে পারে। ফলে মুদ্রা ঝুঁকিও তাদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দেশীয় কোম্পানির আয়েও চাপ

বিদেশি বিনিয়োগ কমার পেছনে শুধু বৈশ্বিক পরিস্থিতিই নয়, দেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল ব্যবসায়িক পরিবেশের কারণে কয়েকটি বড় কোম্পানির মুনাফা ও আয় চাপে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে, গ্রামীণফোনের চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ কমেছে এবং রাজস্ব কমেছে ২.৫ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানিটিতে বিদেশি মালিকানাও কমেছে।

সেপ্টেম্বরের বাজারে কিছুটা ভিন্ন চিত্র

তবে পুরো পরিস্থিতি একমুখী নয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৪ দিনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কেনাকাটায় কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২৫০ কোটি টাকার শেয়ার কিনেছেন এবং প্রায় ১৮০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। অর্থাৎ ওই সময়ে নিট ক্রয় ছিল প্রায় ৭০ কোটি টাকা।

এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বদলে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহে কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে বিষয়টি বাজারসংশ্লিষ্টদের নজরে এসেছে।

নীতিগত সংস্কারে ফিরতে পারে আস্থা?

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অবশিষ্ট কিছু শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, বাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আন্তর্জাতিক সূচক পর্যালোচনার নিয়মিত কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনাকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যানও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধীরে ধীরে ফিরে আসার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশি অর্থপ্রবাহ কমার বিষয়টি শুধু শেয়ারবাজারের সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মুদ্রার স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং খাত, কোম্পানির আয়, জ্বালানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা।

বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আগে বাজারে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুবিধা, মুনাফা প্রত্যাবাসনের সুযোগ, মুদ্রা ঝুঁকি, কর ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতার মতো বিষয় বিবেচনা করেন।

তাই বিদেশি বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনতে শুধু বাজারে শেয়ারদর বাড়ানো যথেষ্ট নয়। স্থিতিশীল নীতি, শক্তিশালী করপোরেট গভর্ন্যান্স, নির্ভরযোগ্য আর্থিক তথ্য, মুদ্রাবাজারের স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য পরিবেশ—এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সেপ্টেম্বরে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিট ক্রয়ের যে আভাস দেখা গেছে, তা বাজারে আস্থার সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত মাত্র। এই প্রবণতা টেকসই হয় কি না, তা নির্ভর করবে আগামী মাসগুলোতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাজার সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতির ওপর।

Post a Comment

0 Comments